রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৮ মিনিটের প্রথম ভাষণে দিকনির্দেশনা নেই, পুরোনো বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ মিন অং হ্লাইং

রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৮ মিনিটের প্রথম ভাষণে দিকনির্দেশনা নেই, পুরোনো বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ মিন অং হ্লাইং

রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৮ মিনিটের প্রথম ভাষণে দিকনির্দেশনা নেই, পুরোনো বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ মিন অং হ্লাইং
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং-এর অভিষেক ভাষণ ছিল মাত্র ১৮ মিনিটের, যেখানে দেশের চলমান সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ কিংবা আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর বিষয়ে ভাষণে সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সামরিক বাহিনী যখন বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে, তখন তার বক্তব্য ছিল মূলত আনুষ্ঠানিকতা ও সাধারণ কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ।

ভাষণের শুরুতেই তিনি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)-কে আক্রমণ করেন। ২০২১ সালে নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে এনএলডি সরকারের পতন ঘটানোর যে যুক্তি তিনি দেখিয়েছিলেন, ভাষণেও সেই একই দাবি পুনরাবৃত্তি করেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক জান্তা-নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনকে তিনি প্রশংসা করেন, যা ব্যাপকভাবে তার প্রেসিডেন্ট হওয়া নিশ্চিত করার জন্য সাজানো প্রহসন হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।

পুরো ভাষণ জুড়েই ছিল সাধারণ ও অস্পষ্ট বক্তব্য, কিন্তু বাস্তবমুখী কোনো পরিকল্পনা ছিল না। রাজনৈতিক সংকট ও চলমান সশস্ত্র সংঘাতের সমাধান হিসেবে তিনি পুনরায় সামনে আনেন স্থবির হয়ে পড়া ‘ন্যাশনওয়াইড সিজফায়ার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনসিএ)’—যা ইতোমধ্যে প্রধান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠনগুলো “অকার্যকর” ঘোষণা করেছে।

তিনি সংক্ষেপে সামরিক বাহিনী প্রণীত ২০০৮ সালের সংবিধানের ৪৩টি ধারা সংশোধনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তবে এসব প্রস্তাবের কোনোটিই সংসদে সামরিক বাহিনীর নিশ্চিত ভেটো ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে না, যেখানে তাদের ২৫ শতাংশ আসন থাকার কারণে তাদের সম্মতি ছাড়া কোনো সংশোধন পাস করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সমর্পণ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সংসদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু অর্থবহ সাংবিধানিক সংস্কার ছাড়া এই উদ্যোগ আবারও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ব্যাপক বেকারত্বের মুখে মিন অং হ্লাইং কেবল নীতিমালা পর্যালোচনা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানি ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেন—যা তার পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত বলে সমালোচনা রয়েছে।

কূটনৈতিক দিক থেকে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং Association of Southeast Asian Nations (আসিয়ান)-এর সঙ্গে সম্পর্ক “স্বাভাবিক” করার প্রতিশ্রুতি দেন, যা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর থেকে দূরত্ব বজায় রাখার ইঙ্গিত দেয়। তবে বাস্তবে তিনি আসিয়ানের ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’ বাস্তবায়নের আহ্বান উপেক্ষা করে যাচ্ছেন। বর্তমান বিশেষ দূত মারিয়া থেরেসা লাজারো সম্প্রতি বিবিসিকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট হলেও মিন অং হ্লাইং আসিয়ানের শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন না।

তিনি চীন-মিয়ানমার সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি’র কথাও উল্লেখ করেন, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত বহন করে।

দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই আশা করেছিলেন, নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউ উইন মিন্ট এবং স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিসহ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু মিন অং হ্লাইং কেবল “উপযুক্ত সাধারণ ক্ষমা বিবেচনা” করার কথা বলেন।

তার একমাত্র নির্দিষ্ট ঘোষণা ছিল একটি ‘ইউনিয়ন কনসালটেটিভ কাউন্সিল’ গঠন, যা নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতি, শান্তি ও আইন প্রণয়ন বিষয়ে পরামর্শ দেবে। তবে এই কাউন্সিলে সাবেক জান্তা সদস্য ও তার ঘনিষ্ঠদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক উপপ্রধান সোয়ে উইন চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাউং মাউং আয়েকে সচিব করা হয়েছে।

নতুন মন্ত্রিসভা ও রাজ্য-অঞ্চল প্রশাসনের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদেও সাবেক জান্তা কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে মিন অং হ্লাইংয়ের প্রথম ভাষণ এবং নতুন সরকার কাঠামোতে বাস্তব কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং এটি স্পষ্ট করেছে যে, নতুন কোনো ধারণা বা নেতৃত্ব নয়—পুরোনো প্রতিশ্রুতি ও অনুগতদের নিয়েই এগোচ্ছে বর্তমান শাসনব্যবস্থা।

প্রসঙ্গত, বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষণ মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো নতুন দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *