আরসা-টিটিবি-টিটিপির ত্রিমুখী জোট বাংলাদেশে, সার্বভৌমত্বে নতুন হুমকি

আরসা-টিটিবি-টিটিপির ত্রিমুখী জোট বাংলাদেশে, সার্বভৌমত্বে নতুন হুমকি

আরসা-টিটিবি-টিটিপির ত্রিমুখী জোট বাংলাদেশে, সার্বভৌমত্বে নতুন হুমকি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

বর্তমানে আন্তঃদেশীয় উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের বিস্তার, রোহিঙ্গা সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। নানা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, আরসা-টিটিবি-টিটিপিকে ঘিরে একটি সমন্বিত ত্রিমুখী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক এই নেটওয়ার্কের পেছনে আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বা স্বার্থসম্পৃক্ততার বিষয়ও উল্লেখ করছেন, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জটিল ও বহুস্তরীয় হুমকি মোকাবেলায় আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে সমন্বিত, তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধ- সবকিছু মিলিয়ে একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগই সম্ভাব্য বড় ধরনের নিরাপত্তা সঙ্কট প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

উল্লেখ্য, নয়া দিগন্ত আগেও একাধিক প্রতিবেদনে আরসা, টিটিবি ও টিটিপির সম্ভাব্য তৎপরতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সেসব বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, এসব গোষ্ঠী উগ্র মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। বর্তমান প্রতিবেদনে ওই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম, কাঠামো ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নতুন কিছু সংবেদনশীল ও কৌশলগত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

আফগানিস্তান-পাকিস্তান প্রেক্ষাপট ও ভারতীয় কৌশল

যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের সাথে তাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ ভারত-অধিকৃত কাশ্মির ইস্যুতে নয়াদিল্লির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এই সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় ভারত মূলত ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ কৌশল গ্রহণ করে। অভিযোগ রয়েছে, এই কৌশলের অংশ হিসেবে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) মদদ দিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার ভাতৃপ্রতিম সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়।

একই সময়ে, আদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও টিটিপি (ধর্মীয় উগ্রবাদী) এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর (বিচ্ছিন্নতাবাদী জাতীয়তাবাদী) মধ্যে একটি কৌশলগত সমঝোতা গড়ে ওঠে। এ ছাড়া টিটিপির সাথে পাখতুন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ‘ইত্তেহাদুল মুজাহিদীন পাকিস্তান’-এর যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চরম সঙ্কটে পড়ে।

কৌশলগত লক্ষ্য ও প্রভাব : বিশ্লেষকদের মতে, তথাকথিত ‘এনিমি ডাইভারশন’ কৌশলটি মূলত আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি পরোক্ষ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কৌশলের মাধ্যমে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

প্রথমত, আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব বিস্তার। পাকিস্তানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা সঙ্কটকে তীব্র করে তুললে দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বহুলাংশে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যয়িত হয়। এর ফলে বহির্মুখী কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কাশ্মির ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া। কাশ্মিরভিত্তিক সঙ্ঘাত দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, অন্যত্র সঙ্ঘাত সৃষ্টি বা তীব্র করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর মনোযোগ বিভক্ত করা সম্ভব হয়, যা মূল ইস্যুর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি। ভিন্ন মতাদর্শ ও স্বার্থসম্পন্ন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাত উসকে দিলে একটি ভ্রাতৃঘাতী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে তারা নিজেদের মধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক ঐক্য দুর্বল হয়ে যায়।

সামগ্রিকভাবে, এই কৌশল প্রতিপক্ষকে সরাসরি মোকাবেলা না করে তাকে ভেতর থেকে ব্যস্ত ও বিভক্ত রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ : নতুন ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক কৌশলের বাইরে বাংলাদেশ নেই। বরং সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশকে ঘিরেও নতুন ধরনের নাশকতার জাল বোনা হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, আনসার আল ইসলাম বর্তমানে টিটিবি (তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ) নাম ধারণ করে একটি শক্তিশালী উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। এই গোষ্ঠীটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে দেশের যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো দেশের গণতান্ত্রিক সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং মূলধারার আলেম সমাজ। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে তারা ভবিষ্যতে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ছক কষছে।

তিনটি উগ্রগোষ্ঠীর পারস্পরিক সমীকরণ

ত্রিমুখী নেটওয়ার্কের কাঠামো বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট তিনটি গোষ্ঠীর ভূমিকা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

প্রথমত, টিটিবি (তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ) মূলত আনসার আল ইসলামের পুনর্গঠিত রূপ হিসেবে বিবেচিত। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, তারা নিজেদের ‘আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (একিউআইএস)-এর সাথে সম্পৃক্ত হিসেবে উপস্থাপন করে। সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এনক্রিপ্টেড অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ, মতাদর্শ প্রচার এবং অর্থায়নের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

দ্বিতীয়ত, টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানকেন্দ্রিক হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের প্রভাব বিস্তারের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তারা আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, সমন্বয় এবং কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে টিটিবির মতো গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হয়।

তৃতীয়ত, আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) রাখাইনভিত্তিক একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যা বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগে আলোচিত। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তারা মাঠপর্যায়ে একটি সক্রিয় উপস্থিতি তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এই তিনটি গোষ্ঠীর পারস্পরিক সংযোগ একটি বহুমাত্রিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে নতুন উদ্বেগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আরসার অপতৎপরতা ও ত্রিমুখী নেটওয়ার্কের বিস্তার

বাংলাদেশে আরসার কার্যক্রম বর্তমানে দু’টি সুনির্দিষ্ট ধারায় বিভক্ত : মাদক ও অর্থায়ন- ইয়াবাসহ বিভিন্ন সিন্থেটিক ড্রাগের চোরাচালানের মাধ্যমে তারা বিপুল অর্থের জোগান দিচ্ছে।

প্রশিক্ষণ ও প্রভাব : রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তাদের গোপন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে। একটি অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তার নিহতের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই গোষ্ঠীটি কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

কিছু গোয়েন্দা তথ্যে দাবি করা হয়েছে যে, রোহিঙ্গা সঙ্কটকে পুঁজি করে কিছু অসাধু চক্র আর্থিক সুবিধার্থে এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নজরদারির কিছুটা সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে তারা ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

আন্তঃসীমান্ত রিক্রুটমেন্ট ও যাতায়াতের রুট

ত্রিমুখী এই নেটওয়ার্কের কার্যপদ্ধতি মূলত দ্বিস্তরভিত্তিক- গোপন (আন্ডারগ্রাউন্ড) ও আংশিক প্রকাশ্য (ওপেন) কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামো নেটওয়ার্কটিকে একইসাথে নমনীয়, বিস্তৃত ও শনাক্ত করা কঠিন করে তুলেছে।

আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে তারা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম, ক্লোজড অনলাইন গ্রুপ এবং ব্যক্তিনির্ভর সংযোগ ব্যবহার করে রিক্রুটমেন্ট, অর্থ লেনদেন ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই স্তরে কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এবং বিশ্বাসভিত্তিক হওয়ায় গোয়েন্দা নজরদারি এড়ানো সহজ হয়। নতুন সদস্যদের যাচাই-বাছাই করে ধীরে ধীরে নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অন্য দিকে ওপেন বা আংশিক প্রকাশ্য পদ্ধতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন কনট্যান্টের মাধ্যমে মতাদর্শিক প্রচারণা চালানো হয়। এখানে সরাসরি সংগঠনের নাম ব্যবহার না করেও ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা, আবেগনির্ভর বক্তব্য এবং নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। এই দুই স্তরের সমন্বয়ে একটি বহুস্তরীয় ও বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যেখানে ওপেন প্ল্যাটফর্ম সম্ভাব্য সমর্থক সৃষ্টি করে এবং আন্ডারগ্রাউন্ড কাঠামো তাদের সক্রিয় সদস্যে রূপান্তর করে। ফলে নেটওয়ার্কটি দীর্ঘমেয়াদে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

বিমানবাহিনীকে ঘিরে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক অভিযান

উপলব্ধ তথ্য ও বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের সামরিক কাঠামো- বিশেষ করে বিমানবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ইমরান হায়দার, মুফতি উসমান (আবু ইমরান) এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে ঘিরে এই নেটওয়ার্কের কথিত সমন্বয় কাঠামোর উল্লেখ পাওয়া যায়। তাদের কার্যক্রমে সামরিক বাহিনীর সংবেদনশীল অংশে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা ছিল বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ধারণা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে কৌশলগত কারণ থাকতে পারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি ক্রয় নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকে সদস্যদের প্রভাবিত করা, ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানো এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সৃষ্টি- এ ধরনের কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একই সাথে অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং ধাপে ধাপে রিক্রুটমেন্টের অভিযোগও উঠে এসেছে।

তবে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, এয়ার ইনটেলিজেন্স ও ডিজিএফআই-এর সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোরসহ বিভিন্ন ঘাঁটিতে এই তৎপরতা পরিচালিত হয় এবং সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অভিযান দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সময়মতো পদক্ষেপ নেয়া না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারত।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও করণীয় : কৌশলগত সুপারিশ

উগ্রপন্থী এই জোট রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার ষড়যন্ত্র করছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা :

১. সমন্বিত গোয়েন্দা কাঠামো- সব গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি ‘সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’ কার্যকর করা।

২. ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স- অনলাইন প্রোপাগান্ডা ও ডার্ক ওয়েব মনিটরিং করার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও জনবল নিয়োগ।

৩. সীমান্ত ও ক্যাম্প নিরাপত্তা- বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় ড্রোন নজরদারি ও কঠোর টহল নিশ্চিত করা।

৪. ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন- পাঠ্যপুস্তক, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলা।

৫. আন্তর্জাতিক কূটনীতি- আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে (ভারত ও মিয়ানমার ব্যতীত অন্যদের সাথেও) তথ্য বিনিময়ের পথ প্রশস্ত করা।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছে, যেখানে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অস্থিতিশীলতার নানা উপাদান একসাথে কাজ করছে। কিছু বিশ্লেষক দাবি করেন, উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলো বাহ্যিক প্রভাব ও স্বার্থের সাথে যুক্ত হয়ে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। তবে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সতর্ক, যাচাইভিত্তিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় আবেগনির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর কৌশল গ্রহণ জরুরি। শক্তিশালী গোয়েন্দা সমন্বয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক সংহতি জোরদার করা এবং উগ্রবাদ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর পথ। পরিকল্পিত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

-নয়া দিগন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *