পার্বত্য চট্টগ্রামের মুরং জনগোষ্ঠী নিয়ে ফান্ডেড প্রোপাগান্ডা
![]()
নিউজ ডেস্ক
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো (মুরং) জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ‘নেত্র নিউজ’ তাদের ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিও ফান্ডেড প্রোপাগান্ডা বলে তুলে ধরেছে ফ্রাইডে পোস্ট।
ফ্রাইডে পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি একটি জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে বহুমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে অনেকাংশে নির্বাচিত ফ্রেমিং, আবেগপ্রবণ বর্ণনা এবং ফান্ডেড প্রোপাগান্ডা নির্মাণের ওপর নির্ভর করেছে।
ফ্রাইডে পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবেদনটির শুরু থেকেই দর্শকের সামনে একটি নৈতিক আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা লক্ষ করা যায়। ‘পরিচয় হারাচ্ছে ম্রো শিশুরা’—এ ধরনের শিরোনাম ও বর্ণনাভঙ্গি স্বভাবতই দর্শককে একটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। এখানে দারিদ্র্য, মাদ্রাসা শিক্ষা, নাম পরিবর্তন, ধর্মান্তর এবং জাতিগত অস্তিত্বের সংকট—এই বিষয়গুলোর মধ্যে একটি সরলরৈখিক সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, দারিদ্র্য থেকে শিক্ষা, শিক্ষা থেকে ধর্মান্তর, এবং ধর্মান্তর থেকে জাতিগত পরিচয়হানি—এমন একটি কারণ-ফল সম্পর্ক নির্মাণ করা হয়েছে, যা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি সরলীকৃত। অথচ একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্মচর্চা, সামাজিক অভিযোজন ও ঐতিহাসিক বিবর্তন—এসব কখনোই এত সরল সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না।’
ফ্রাইডে পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রতিবেদনটিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা ‘জাতিগত নিধন’-এর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক পরিভাষাও ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের শব্দ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক পরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় বা সংগঠিত সহিংসতা এবং সুদৃঢ় তথ্যভিত্তিক প্রমাণের আলোকে ব্যবহার করা হয়। ভিডিওটিতে সেই অর্থে বিস্তৃত পরিসংখ্যান, দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের জরিপ, বা একটি প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগত ভিত্তি দেখা যায় না। ফলে এমন শব্দের ব্যবহার প্রতিবেদনের ভাষাগত তীব্রতা বাড়ালেও, বিশ্লেষণাত্মক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায় না; বরং তা আবেগপ্রবণতা ও মতাদর্শিক অবস্থানকে বেশি দৃশ্যমান করে।’
ম্রো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে একমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতাও এক প্রকারের সমস্যা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী ম্রোদের ধর্মীয় বাস্তবতা বরাবরই বহুমাত্রিক। তাদের আদি বিশ্বাস ছিল প্রকৃতিপূজা বা অ্যানিমিজমভিত্তিক। পরবর্তীকালে তাদের ভেতরে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব দেখা যায়। ১৯৮০-এর দশকে মেনলে ম্রো-র উদ্যোগে ‘ক্রামা’ নামে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ধারা গড়ে ওঠে, যা ম্রো পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সময়ের প্রবাহে ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ খ্রিস্টধর্মেও ধর্মান্তরিত হয়েছে—এমন দাবিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। অর্থাৎ, ম্রোদের ধর্মীয় ইতিহাস নিজেই একটি পরিবর্তনশীল, বহুস্তরীয় ও দীর্ঘকালব্যাপী প্রক্রিয়া। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে ইসলামে ধর্মান্তরকে এককভাবে ‘পরিচয় বিলোপ’-এর চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে দেখানো নিঃসন্দেহে প্রোপাগাণ্ডা।’
প্রতিবেদনে নেত্র নিউজের তথ্য ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। বলা হয়, ‘যদি ধর্মীয় রূপান্তরই একটি জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বা পরিচয়গত সংকটের মূল প্রশ্ন হয়, তাহলে সেই আলোচনায় খ্রিস্টধর্মে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মান্তর, মিশনারি কার্যক্রম, আদি বিশ্বাস থেকে সরে যাওয়া, অথবা স্থানীয় ধর্মীয় রূপান্তরের তুলনামূলক বিশ্লেষণও থাকা উচিত ছিল। কিন্তু প্রতিবেদনে ইসলামে ধর্মান্তরকে কেন্দ্রীয় সঙ্কট হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, অন্যান্য ধর্মীয় রূপান্তর প্রসঙ্গ কার্যত অনুপস্থিত।’
ফ্রাইডে পোস্টের প্রতিবেদনে পার্বত্যনিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশের এ বিষয়ে প্রকাশিত বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়- ‘তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু দশক ধরে চলমান খ্রিস্টান মিশনারি প্রভাব এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় রূপান্তরের বৃহত্তর চিত্র। প্রতিবেদনে মেহেদী হাসান পলাশের নিজের অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্য যুক্তি ও প্রামাণ্য তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের পুরোটাই তুলে ধরা হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
”কয়েক বছর আগের কথা। ঢাকায় একটি সেমিনারে মুরং সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে বেশ জোরালো বক্তব্য দিলেন। এবং পাহাড়ের ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীরা খুব দ্রুত ইসলামাইজেশন হচ্ছে, সেটা নিয়ে নানা যুক্তি ও তথ্য তুলে ধরলেন। তার বক্তব্য শেষে আমি দাঁড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনার নাম কি? তিনি নামটি বললেন। নামের একটি অংশে ক্রিস্টিয়ান শব্দ যুক্ত ছিল। আমি বললাম, আপনার ধর্ম কি? তিনি বললেন, খ্রিস্টান। আমি বললাম, মুরং সম্প্রদায়ের আদি ধর্ম কি? তিনি বললেন, ক্রামাধর্ম। আমি বললাম, আপনার কাছে সর্বশেষ প্রশ্ন, মুরং সম্প্রদায়ের কত শতাংশ লোক খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে? তিনি বললেন, ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। আমি তখন তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনার মুরং সম্প্রদায়ের ৯০ শতাংশ লোক আদি বা ক্রামাধর্ম থেকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। সেটা নিয়ে আপনার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু একই সম্প্রদায়ের এক থেকে দুই শতাংশ লোক মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, সেটা নিয়ে আপনার এতো উদ্বেগ। আপনার পূর্বপুরুষ বা আপনি নিজেও খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। সেটা নিয়ে আপনার কোনো বক্তব্য নেই। এ দিয়ে প্রমাণিত হয় যে, আপনি খ্রিস্টানিটি ভার্সেস ইসলাম এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরা। বৌদ্ধ সম্প্রদায় এ নিয়ে এত বেশি কথা বলে না। কারণ তারাও এই ক্রিশ্চিয়ানাইজেশনের শিকার। কয়েক বছর আগেও চাক সম্প্রদায়ের লোকেরা ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পর্যন্ত দিয়েছিল। চাকরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে মিশনারীদের তৎপরতায় বিপুল পরিমাণ চাক বর্তমানে ক্রিস্টিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ট্রাইবাল সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মান্তরিত হবার যে প্রবণতা তা প্রধানত ক্রিশ্চিয়ানাইজেশনের প্রতি। এভাবেই খিয়াং, বম, পাংখো, লুসাই, গারো সম্প্রদায় শতভাগ ক্রিস্টিয়ানাইজেশন হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে কোন আলাপ নেই কোথাও। ১৪৩০ সালের কাছাকাছি সময়ে মিয়ানমারের আরাকানে খুমি সম্প্রদায়ের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে মুরং বা ম্রো সম্প্রদায় বান্দরবনের লামা, আলিকদম সহ বিভিন্ন উপজেলায় এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন শুরু করে। শুরুতে এই জনগোষ্ঠী সর্বপ্রাণ ধর্ম বা প্রকৃতি পূজারী ছিল। পরবর্তীকালে এদের অনেকে বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। ১৯৮০ সালের দিকে তারা ক্রামা ধর্ম নামে একটি নিজস্ব ধর্মে সৃষ্টি করে এবং এই ধর্ম মুরং সম্প্রদায় গ্রহণ করে। তবে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ মুরং খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে। খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেও সাংস্কৃতিকভাবে তারা মুরংদের কিছু উৎসব যেমন, গো হত্যা উৎসব- এ জাতীয় উৎসবগুলো পালন করে এবং এগুলো পালনে বাধা দেয় না লোকাল খ্রিস্টান মিশনারীরা। এটা অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও সত্য। অন্যান্য সম্প্রদায়ের যারা খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, তারা খ্রিস্টান ধর্ম পালনের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব পালন করে। যেমন বিজু উৎসব, ফুল পূজা, পানি খেলা ইত্যাদি। এমনকি নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে না। এতে লোকাল মিশনারিগুলো বাধা দেয় না। এটা একটা তাদের কৌশলগত কারণ। একটি জনগোষ্ঠী তাদের আদি ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ খ্রিস্টান হয়ে গেছে। সেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। মিডিয়ায় কোনো রিপোর্ট নেই। কিন্তু এক থেকে দুই শতাংশ মুসলিম হয়েছে, সেটা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সড একটি গণমাধ্যম বিশাল রিপোর্ট করেছে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাহাড়ে ব্যাপকভাবে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে, সেটা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কিন্তু কিছু মানুষ মুসলিম হলে সেটা নিয়ে আলোচনা, গবেষণা, রিপোর্টিং এগুলো সবসময়ই ঘটে থাকে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, পাহাড়ে ইসলামাইজেশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়। এই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ই মূলত ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে। যে গণমাধ্যমটি এই রিপোর্টিং করার জন্য ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করেছে, অনুসন্ধান করেছে, তারা এই প্রকাশ্য সত্যটি খুঁজে পায়নি। বলা ভালো দেখেনি, দেখতে চাইনি। না হলে যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে অন্তত তাদেরকেও একটি প্রশ্ন করতে পারত যে, ইসলামের পাশাপাশি আপনাদের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিত ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে? কেন হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে? যদি গণমাধ্যমটি এই মর্মে রিপোর্ট করত যে, মুরং সম্প্রদায় তাদের আদি ধর্ম হারিয়ে ফেলছে, ধর্মান্তরিত হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মে। এ নিয়ে আমার কোন বক্তব্য থাকত না বরং সেটি লজিক্যাল হত। সেটি সমর্থনযোগ্য হতো। তা না করে তারা প্রিয় ৯০% ধর্মান্তরিত ক্রিশ্চিয়ানদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখাচ্ছে, কীভাবে মুরং সম্প্রদায়ের লোকজন এক থেকে দুই পার্সেন্ট মুসলিম হচ্ছে। এটা কতটা বায়াসড রিপোর্টিং তা আর বলার প্রয়োজন আছে কি?”
-পার্বত্য নিউজ।