উত্তর চিনে নিয়ন্ত্রণের দাবি, দক্ষিণ চিনে বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি মিয়ানমার জান্তার
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী উত্তর চিন রাজ্যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই এবার দক্ষিণ চিন রাজ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে সামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া সদস্য ও স্থানীয় প্রতিরোধ সূত্রগুলো।
বুধবার জান্তা সরকার দাবি করে, আট মাসব্যাপী “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” শেষে তারা হাখা, থান্টল্যাং, ফালাম, তেদিম, তোনজাং ও সিখাসহ উত্তর চিন রাজ্যের পুরো অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। একইসঙ্গে তারা জানায়, খুব শিগগিরই উত্তর চিন ও পার্শ্ববর্তী সাগাইং অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।
তবে প্রতিরোধ বাহিনীগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, সিখা, রিখাওদার ও থান্টল্যাং এবং এসব এলাকার সংযোগ সড়ক এখনো তীব্র সংঘর্ষপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরাঞ্চলে যুদ্ধ চলমান থাকলেও সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে দক্ষিণ চিনে নতুন আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, চিন সীমান্তবর্তী ম্যাগওয়ে অঞ্চলের সাও টাউনশিপে সেনা সমাবেশ বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানকার সিকফিউয়ের KaPaSa-22 এবং পাকের KaPaSa-24 সামরিক অস্ত্র কারখানাগুলোতেও সেনা ও সরঞ্জাম জড়ো করা হচ্ছে। প্রতিদিন Y-12 পরিবহন বিমানের মাধ্যমে এসব ঘাঁটিতে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া সীমান্তবর্তী তিলিন এলাকাতেও অতিরিক্ত সেনা পাঠানো হয়েছে।
বুধবার সিকফিউ থেকে প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত সেনা সীমান্তবর্তী কিয়াউখতু শহরে মোতায়েন করা হয়।
কিয়াউখতু শহরে একটি বিমানঘাঁটি রয়েছে এবং এটি দক্ষিণ চিনের মিনদাত ও কানপেতলেতমুখী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগস্থলের পাশে অবস্থিত। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দুই বছর আগেই সামরিক বাহিনী ওই বিমানঘাঁটির উন্নয়নকাজ শুরু করেছিল।
কিয়াউখতুর দক্ষিণে অবস্থিত সাও শহরকে দক্ষিণ চিনে প্রবেশের প্রধান গেটওয়ে হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পূর্বে সিকফিউ ও পাক, পশ্চিমে কানপেতলেত ও মিনদাত এবং উত্তরে তিলিন অবস্থিত। সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া সাবেক মেজর সোয়ে তাও বলেন, বড় সামরিক অস্ত্র কারখানাগুলোর নিকটবর্তী হওয়ায় সাও শহরটি জান্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে সহজেই চিনে অস্ত্র ও অতিরিক্ত সেনা পাঠানো যায়।
প্রতিরোধ সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কিয়াউখতু ও সাও এলাকায় অন্তত দেড় হাজার সেনা জড়ো করা হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রবর্তী ইউনিটগুলো মিনদাত থেকে মাত্র ১৯ কিলোমিটার এবং কানপেতলেত থেকে ৯ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে।
মিনদাতের এক বাসিন্দা বলেন, “আগে তারা কিয়াউখতু থেকে মিনদাতে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু এখন সাও এলাকায় সেনা জড়ো করছে কানপেতলেত আক্রমণের জন্য। সম্ভবত তারা প্রথমে কানপেতলেত দখল করে পরে দুই দিক থেকে মিনদাতে অগ্রসর হতে চায়।”
বৃহস্পতিবার সকালে কানপেতলেত টাউনশিপে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়, যখন সামরিক বাহিনীর কলামগুলো বিমান হামলার সহায়তায় শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
দক্ষিণ চিন অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, কারণ এটি রাখাইন রাজ্যে প্রবেশের একটি প্রধান করিডোর। বর্তমানে আরাকান আর্মি (AA) রাখাইনের ১৭টির মধ্যে ১৪টি টাউনশিপ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বাকি তিনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে দক্ষিণ চিন মূলত প্রতিরোধ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চিন ব্রাদারহুড ও তাদের মিত্ররা কিইন্ডওয়ে, মাতুপি, মিনদাত ও কানপেতলেত নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে রাখাইন সীমান্তবর্তী পালেতওয়া শহর আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া সদস্যরা মনে করছেন, রাখাইনের জন্য একটি বাফার জোন হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় দক্ষিণ চিনে জান্তাবাহিনীকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।
চিন ব্রাদারহুডের মুখপাত্র সালাই টিমি বলেন, “জান্তা হয়তো উত্তর চিনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করছে, কিন্তু দক্ষিণে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে দেশটির সামরিক সরকারের সংঘাত ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।