আদালতে ২০ বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়, ডিসিরা ‘জেলা প্রশাসক’ নন

আদালতে ২০ বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়, ডিসিরা ‘জেলা প্রশাসক’ নন

আদালতে ২০ বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়, ডিসিরা ‘জেলা প্রশাসক’ নন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

দেশের জেলাগুলোর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের পদবি ডেপুটি কমিশনার (ডিসি)। তারা ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের ‘জেলা প্রশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

জেলায় তাদের দপ্তরের নাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। যদিও সরকারি আইন, বিধি বা প্রশাসনিক কাঠামোর কোথাও ‘জেলা প্রশাসক’ নামে কোনো পদ নেই। তার পরও দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটি কমিশনারের পরিভাষা হিসেবে শব্দটি ব্যবহার হওয়ায় এর আইনি ভিত্তি ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়।

‘জেলা প্রশাসক’ পদবি ব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট হয় দুই দশক আগে। ২০০৬ সালের ওই রিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বরগুনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। এতে দাবি করা হয়, সংবিধানের ৭, ২২, ২৭, ৩১, ১১১, ১১২, ১১৬ ও ১১৬(এ) অনুচ্ছেদ এবং বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ বিষয়ে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থীভাবে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

রিটে আরো উল্লেখ করা হয়, সরকারি পরিভাষা ও রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী ডিসির বাংলা পদবি ডেপুটি কমিশনার; ‘জেলা প্রশাসক’ নামে কোনো পৃথক সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক পদ নেই। পাশাপাশি বলা হয়, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার নির্দেশনা দেয় এবং ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক, শাসক বা প্রশাসক নন। তাই ‘জেলা প্রশাসক’ পদবি ব্যবহার এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনা ও ক্ষমতা পৃথক্‌করণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে রিটে দাবি করা হয়।

ওই রিট মামলার আইনজীবী সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‍জেলা প্রশাসক পদবিটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক। এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এর সরাসরি পরিপন্থী। গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে “‍প্রশাসক” শব্দটি যায় না। রিটটি এখনো আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন যে রিপোর্ট প্রকাশ করে সেখানেও জেলা প্রশাসক পদবির বিপক্ষে মতামত পাওয়া যায়।’

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন ও বিধিমালায় ‘জেলা প্রশাসক’ শব্দের সরাসরি উল্লেখ নেই। এ পদকে জেলার সর্বময় কর্তৃত্ব হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা রয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামো মূলত শাসন ও নিয়ন্ত্রণভিত্তিক হওয়ায় স্বাধীনতার পরও সেই মানসিকতার পূর্ণ পরিবর্তন হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং প্রশাসন তাদের সেবক হলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ভূমিকায় কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা দেখা যায়। ফলে ‘ডেপুটি কমিশনার’ বা ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেট’-এর পাশাপাশি ‘জেলা প্রশাসক’ পরিচয়ও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ‘পদবির পরিভাষা’ গ্রন্থে ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর বাংলা করা হয়েছে ‘জেলা প্রশাসক’। একই প্রকাশনায় ‘ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস’-এর বাংলা ‘উপকর কমিশনার’, ‘ডেপুটি কমিশনার অব কাস্টমস’-এর বাংলা ‘উপকমিশনার, কাস্টমস’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ’-এর বাংলা ‘উপপুলিশ কমিশনার’ করা হয়েছে। একইভাবে বিভাগীয় প্রশাসনে যিনি দায়িত্ব পালন করেন, তার পদবি ‘কমিশনার’, পরিভাষায় যা ‘কমিশনার’ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে ‘কমিশনার’কে ‘বিভাগীয় প্রশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে কেবল ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর ক্ষেত্রেই কেন ভিন্নধর্মী বাংলা পরিভাষা ব্যবহার করা হলো।

1

বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে থাকার কথা। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদেও স্থানীয় প্রশাসনিক শাসনের ভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ কার্যকরভাবে ক্ষমতায়িত না হওয়ায় মাঠ প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বই প্রধান হয়ে উঠেছে।

বাংলা পদবি ‘জেলা প্রশাসক’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ঐতিহ্য ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌অন্যান্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে যেভাবে সুনির্দিষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বাংলা পরিভাষা নির্ধারণ করা হয়েছে, জেলা প্রশাসনের ক্ষেত্রেও তা করা যেত। কিন্তু এখানে “‍জেলা প্রশাসক” শব্দটি এমন এক ধারণা তৈরি করে, যেখানে জেলার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এককভাবে ডিসির হাতে কেন্দ্রীভূত বলে প্রতীয়মান হয়। এ শব্দচয়ন শুধু অনুবাদের বিষয় নয়, বরং প্রশাসনিক মানসিকতারও প্রতিফলন। এতে প্রশাসকের ভূমিকাকে একটি কর্তৃত্ববাদী বা সর্বময় ক্ষমতাধর অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা প্রকাশ পায়, যা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অংশীদারত্বমূলক ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। “‍জেলা প্রশাসক” শব্দের পরিবর্তে আরো নিরপেক্ষ ও প্রশাসনিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিভাষা ব্যবহার করা হলে প্রশাসন ও জনগণের সম্পর্ক আরো স্পষ্ট ও অংশগ্রহণমূলক ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াতে পারত। এতে প্রশাসন সম্পর্কে জনগণের মধ্যে কর্তৃত্ব নয়, বরং সেবামূলক রাষ্ট্রের ধারণা আরো জোরালোভাবে প্রতিফলিত হতো।’

ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) পদের শেকড় ব্রিটিশ আমলের জেলা কালেক্টর ব্যবস্থায়। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস জেলা কালেক্টর ব্যবস্থা চালু করেন, যার মূল দায়িত্ব ছিল রাজস্ব আহরণ। পরবর্তী সময়ে কালেক্টরদের বিচারিক ও নির্বাহী ক্ষমতাও দেয়া হয় এবং তারা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ঔপনিবেশিক যুগে নতুন বা বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলে প্রধান নির্বাহী ও রাজস্ব কর্মকর্তাকে ‘ডেপুটি কমিশনার’ বলা হতো। পূর্ববঙ্গে দীর্ঘদিন ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর’ পদবিই বেশি প্রচলিত থাকলেও কিছু অঞ্চলে ডেপুটি কমিশনার পদ ব্যবহার করা হতো। পরে ১৯৬০-এর দশক থেকে সারা দেশে ‘ডেপুটি কমিশনার’ পদবির ব্যবহার ব্যাপকভাবে চালু হয়। সময়ের সঙ্গে এ পদের দায়িত্ব রাজস্ব প্রশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবেলা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে জেলা পর্যায়ে সরকারের প্রধান মাঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে ডেপুটি কমিশনার দায়িত্ব পালন করেন, যাকে বাংলায় ‘জেলা প্রশাসক’ বলা হয়।

সাবেক সচিব শামীম আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ব্রিটিশ শাসনামলে জেলার প্রধান প্রশাসনিক ও রাজস্ব কর্মকর্তা ছিলেন “‍কালেক্টর”। সময়ের প্রয়োজনেই পরে তাকে “‍ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট” হিসেবে বিচারিক ক্ষমতাও দেয়া হয়। আইয়ুব খানের আমলে “‍ডেপুটি কমিশনার” পদবির প্রচলন ঘটে। পরবর্তী সময়ে এ “‍ডেপুটি কমিশনার” ধারণারই বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে “‍জেলা প্রশাসক” ব্যবহার শুরু হয়। বিভিন্ন ক্যাডারের পদবি অনুবাদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের পরিভাষাগত রূপান্তর দেখা যায়। যেমন “‍সিভিল সোসাইটি”র বাংলা করা হয়েছে “‍সুশীল সমাজ”, যদিও এর আক্ষরিক অর্থ ভিন্ন হতে পারত। একইভাবে “‍ডেপুটি কমিশনার”, “‍কমিশনার”, “‍কমিশনার অব ট্যাক্সেস” বা “‍কমিশনার অব কাস্টমস”—এসব শব্দের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক বাস্তবতা অনুযায়ী আলাদা আলাদা পরিভাষা তৈরি হয়েছে। নামকরণ নয়, মূল বিষয় হলো কাঠামোগত ধারাবাহিকতা। নামকরণের এ ভিন্নতা মূলত ঐতিহাসিক এবং প্রশাসনিক বিবর্তনের ফল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের সাবেক এক সিনিয়র সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আইন-বিধিতে ‘‌‘জেলা প্রশাসক’’ বলে কোনো পদ নেই এটা সত্য। আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র ব্রিটিশ, ভারতীয় ও পাকিস্তানি আমলাতন্ত্রের লিগ্যাসি বহন করছে। সে ধারাবাহিকতায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর প্র্যাকটিস অনুযায়ী পদবির নামকরণ হয়েছে।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

এদিকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বিদ্যমান পদবি পরিবর্তন করার সুপারিশ করেছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। কমিশনের প্রতিবেদনকে জেলা প্রশাসকের নাম ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কমিশনার’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্মকর্তারা নিজেদের জনগণের সেবক নয়, বরং কর্তৃত্বশীল প্রশাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন। জেলা প্রশাসকদের ক্ষেত্রে “‍ডেপুটি কমিশনার” বা “‍জেলা ম্যাজিস্ট্রেট”-এর মতো আইনসম্মত পদবির পরিবর্তে “‍জেলা প্রশাসক” পরিচয়ের ব্যবহারও সেই মানসিকতার প্রতিফলন। পদবির প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত সংস্কৃতি।‘

তবে ‘জেলা প্রশাসক’ পদবির ব্যবহার ঐতিহ্যগতভাবেই হয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) ফারাহ শাম্মী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক আগ থেকেই এটি (জেলা প্রশাসক) ব্যবহার হয়ে আসছে। মূলত ঐতিহ্যগতভাবেই বলা হয়।’

‘জেলা প্রশাসক’ শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত তথ্যের জন্য জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একই অনুবিভাগের যুগ্ম সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। যোগাযোগ করা হলে জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি দেখে জানাতে হবে।’

-বণিক বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *