আন্তর্জাতিক ইন্ধন আর মারমাদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতার নতুন ছক ইউপিডিএফের, সামনে মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে ঘেরা দেশের গুরুত্বপূর্ন অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থী ও যুব সমাজকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মদদে নতুন করে ৩ জেলায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির নীলনকশা কষছে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন উপজাতিভিত্তিক আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পাহাড়ে মারমা শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল (বিএমএসসি)’র একটি অংশকে সামনে রেখে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে তরুণদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে মারমা যুবকদের বহু যুবক সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে গিয়ে সেরেছেন সশস্ত্র প্রশিক্ষণও। এর পেছনে ইউপিডিএফ ছাড়াও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কয়েকটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
২০২৪ সালের সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরী
জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৪ সালের শেষের দিকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় একটি জাতিগত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মামুন নামে এক বাঙালি যুবককে গণপিটুনিতে হত্যা করে উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনা স্থানীয় বাঙালিরা ১৯ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ মিছিল করতে গেলে প্রকাশ্যে অস্ত্র উচিয়ে বাঙালিদের উপর গুলি এবং গুলি পরবর্তী বাঘাইছড়ি-লংগদু থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে সশস্ত্র সদস্যদের এনে পাহাড়ি-বাঙ্গালি সংঘাতের প্লট তৈরী করে ইউপিডিএফ। দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে শতাধিক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
দ্রুত সময়ে এই ঘটনার রেশ খাগড়াছড়ি জেলা সদর ও রাঙামাটিতে ছড়িয়ে দেয় ইউপিডিএফ, তাদের সহযোগী সংগঠন যুব সমিতি, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পিসিপি। এমনকি পরদিন শুক্রবার রাঙামাটিতে রিজার্ভ বাজারে একটি মসজিদে সংঘবদ্ধ হামলা চালায় ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। ভাংচুর করা হয় বাঙালি নিয়ন্ত্রনাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, হাসপাতাল, ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

এছাড়া খাগড়াছড়ি জেলা সদরে সড়ক আটকে বাঙালিদের উপর হামলা, বাড়িঘরে হামলা এমনকি সড়কে চলাচলরত সেনাবাহিনীর গাড়িতে হামলা চালায় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। সেসময় গুলিবর্ষণ, হামলা ও সহিংসতায় মোট ৩ জন নিহত হন। রাঙামাটিতে একজন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি শহরে ১৪৪ ধারা জারি, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
পরবর্তীতে খাগড়াছড়িতে মামুন হত্যাকাণ্ড এবং রাঙামাটির নিহতের ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। এই ঘটনাটি ২০২৪ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর জেরে তিন পার্বত্য জেলাজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
কথিত ধর্ষণ ও জুম্ম ছাত্র-জনতার প্লট
মোটামুটি বছরখানেক খানিকটা শান্ত থাকলেও ভারতীয় মদদপুষ্ট ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের ষড়যন্ত্রের ছক আবারও অস্থির করে তোলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে। ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেলচালক মামুন হত্যাকে কেন্দ্র করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং অঙ্গসংগঠনগুলো দীঘিনালা ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর এ ঘটনার এক বছর পূর্তিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউপিডিএফ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করে এবং অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করে।
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ রাতে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় এক মারমা স্কুলছাত্রীর ধর্ষণের অভিযোগকে আমলে নিয়ে ইউপিডিএফের দাবিকৃত সন্দেহভাজন শয়ন শীলকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে নেওয়া হয়। ঘটনাটির সত্যতা বিচারে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় শয়ন শীলকে গ্রেপ্তার করা সত্ত্বেও ইউপিডিএফের অঙ্গসংগঠন বিএমএসসি-পিসিপি নেতা উখ্যানু মারমা রাতারাতি ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে ২৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৫ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের আহ্বানে খাগড়াছড়িতে অর্ধবেলা হরতাল পালিত হয়।

২৬ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের কর্মী উখ্যানু মারমার নেতৃত্বে ও সামাজিক মাধ্যমে দেশি, প্রবাসী ব্লগারসহ পার্বত্য জেলার কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির উসকানিমূলক প্রচারণার প্রভাবে পুরো খাগড়াছড়িতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবরোধ চলাকালে এক পর্যায়ে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা টহলরত সেনাদলের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ফলে তিনজন সেনাসদস্য আহত হন। সার্বিক পরিস্থিতি এবং উসকানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য, সংযম ও মানবিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকে।
২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ এবং অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা আবারও দাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা চালান। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন স্থানে বাঙালিসহ সাধারণ মানুষের ওপর গুলি, ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ এবং রাস্তা অবরোধসহ নাশকতা করে সমগ্র খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটান। এদিন দুপুর নাগাদ সামগ্রিক বিষয়টি পাহাড়ি-বাঙালির একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেয়। অবস্থা বিচারে জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
এমতাবস্থায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চরম ধৈর্যের সঙ্গে সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং একটি অবশ্যম্ভাবী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করা সম্ভব হয়।
খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে জেলার গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সাধারণ জনগণকে উসকে দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে গুইমারা-খাগড়াছড়ি রাস্তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়।

সকাল সাড়ে ১০টায় ইউপিডিএফের কর্মী ও সন্ত্রাসীরা এলাকার বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এ পর্যায়ে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তারা অস্ত্রশস্ত্র, ইটপাটকেল, গুলতি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এতে সেনাবাহিনীর ৩ জন অফিসারসহ ১০ জন সদস্য আহত হন। একই সময় তারা রামগড় এলাকায় বিজিবির গাড়ি ভাঙচুর করে এবং বিজিবি সদস্যদের আহত করে। সংঘর্ষ চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রামসু বাজারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত উঁচু পাহাড় থেকে ইউপিডিএফ সশস্ত্র দলের সদস্যরা চার থেকে পাঁচবার অটোমেটিক (স্বয়ংক্রিয়) অস্ত্র দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত পাহাড়ি, বাঙালি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে ১০০-১৫০টি গুলিবর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলে সংঘর্ষে লিপ্ত এলাকাবাসীর মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। এমতাবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর টহল দল দ্রুত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করার লক্ষ্যে ওই এলাকায় যায়। সেনাবাহিনীর তৎপরতায় ওই সশস্ত্র দলটি দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। সেদিনকার ইউপিডিএফের প্রকাশ্যে গুলির বিষয়টি সামনে আসে একটি ভিডিওর মাধ্যমে।
সেনাবাহিনীর তৎপরতায় টিকতে না পেরে রামসু বাজার, বাঙালি ব্যবসায়ীদের আড়ৎ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং বাঙালিদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় লিপ্ত হয় ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রামসু বাজার ও গুইমারা এলাকায় অতিরিক্ত সেনাদল নিয়োগ করা হয় এবং বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে সেদিন। এতে অন্তত তিনজন নিহত, বহু মানুষ আহত হন এবং প্রায় ৮৫টি দোকান ও বসতঘর পুড়ে যায়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং ঘটনাটি নিয়ে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।

সাউথইস্ট এশিয়া জার্নাল’র হাতে আসা বেশকিছু ফুটেজ ও ছবি বিশ্লেষন করে দেখা গেছে, হাতে অকটেন-কেরোসিন নিয়ে সেদিনকার ঘটনায় ঘরে ঘরে প্রবেশ করে আগুন দেয় ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। ভিডিও ও অডিওতে স্পষ্ট দেখা ও শোনা গেছে ইউপিডিএফ অগ্নিসংযোগ ছাড়াও হিন্দু বাড়ি বাড়িতে ব্যাপক লুটপাটও চালায়। এছাড়া রামসু বাজার ও এর আশে-পাশের বাড়ির মন্দিরঘরে হিন্দু ধর্মের মুর্তিকেও ছাড় দেয়নি সন্ত্রাসীরা। বাঙালিদের বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়কে সংঘাতে জড়াতে সেদিন হিন্দুদের দেবতা লোকনাথের মুর্তিকেও ছাড় দেয়নি ইউপিডিএফ।
সূত্র বলছে, সংখ্যালঘু ট্রাম্পকার্ড খেলতে ভারতকে সুবিধা করে দিতেই ২০২৫ সালের কথিত ধর্ষনের প্লট সাজানো হয়েছিলো। ওই ঘটনায় পরিকল্পিত ভাবে আসামী বানানো হয় খাগড়াছড়ির বাপ্পী শীলের ছোট ছেলে চয়ন শীল নামের হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক ছাত্রকে। আবার আন্দোলনের নামে গুইমারায় খড়ক নেমে আসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর। অগ্নিকান্ড, লুটপাট, বাড়ির মন্দির পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটনায় জুন্ম ছাত্র জনতা তথা ইউপিডিএফ।

রামসু বাজার সহিংসতার অনুসন্ধানে উঠে আসে আসল চিত্র। পরিকল্পিত ভাবে অকটেন নিয়ে ঘরে ঘরে ঢুকে দামী জিনিসপত্র লুটপাটের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করা হয় হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে। এমনকি একটি ভিডিওর চিত্রে উঠে আসে সুমন ঘোষ, গণেশ ঘোষ ও ঝন্টু পাল নামের তিনজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীর হলুদের গুদামে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এতে ক্ষতি হয় অন্তত ১২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে নির্যাতন করা হচ্ছে, ভারতে এমন ট্রাম্পকার্ড তৈরী করে দিতেই ইউপিডিএফ ২০২৫ সালে এমন পরিকল্পিত ঘটনা ঘটায়।
পরবর্তীতে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের চিকিৎসক দলের করা মেডিকেল পরীক্ষায় ওই মারমা ছাত্রীকে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ২৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসক জয়া চাকমাসহ তিনজন চিকিৎসকের স্বাক্ষরিত মেডিকেল রিপোর্টে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ না মেলায় পুরো ঘটনাটি যে ইউপিডিএফ ও জম্ম ছাত্র জনতার তৈরী করা প্লট তা সহজেই প্রমাণ হয়ে যায়।
জুম্ম ছাত্র জনতার ইউপিডিএফ প্রীতি
উক্যনু মারমা ও সাচিং মারমা ইউপিডিএফ সংশ্লিষ্টার বিষয়টি লোকমুখে শোনা গেলেও তা প্রথম গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেন তৎকালীন অন্তবর্তী সরকারের পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে রাঙামাটি শহরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’-এর প্রতিনিধিত্ব করা ব্যক্তিরা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত। সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা নামে যে গ্রুপটা হয়েছে, তাদের সঙ্গে আমি আজ কথা বলেছি। ছয়জন এসেছিলেন তাঁরা, ছয়জনই ইউপিডিএফের।’
এদিন জুম্ম ছাত্র-জনতার হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ছয়জন হলেন—কৃপায়ন ত্রিপুরা, ছদক চাকমা, পিন্টু চাকমা, তোষিতা চাকমা, মানিক চাকমা ও বাগীশ চাকমা। তবে প্রধান সমন্বয়ক উক্যনু আর সাচিং সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
সেসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, কথিত ধর্ষণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে সহিংসতা উসকে দেওয়া এবং নাশকতার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে একটি মহল, যাদের পেছনে বহিঃশক্তির ইন্ধন রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হয়।
এবার সেই বর্ষপূর্তিকে ঘিরে নতুন করে আরেকটি ভয়াবহ প্লট তৈরীর পরিকল্পনা করছে ইউপিডিএফ। ২০২৪ সালে নিজেরা সরাসরি সামনের সারিতে ভুমিকা রাখলে ২০২৫ সালে তারা ভর করে জুম্ম ছাত্র জনতার উপর। আর এবার মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলকে ব্যবহার করার তথ্য নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৫ সালেও এই একই সংগঠন ইউপিডিএফ ও জুম্ম ছাত্র জনতার ষড়যন্ত্রের আগুনে ঘি ঢালার মতো সহায়তা করেছিলো।
সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র প্রশিক্ষন
গত এক বছরেও বসে ছিলোনা ইউপিডিএফ। আলুটিলায় কথিত মসজিদ নির্মানের অসত্য অভিযোগ তুলে বিভিন্ন অপতৎপরতা চালায় সংগঠনটি। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ পাহাড়ি শিক্ষার্থী ও যুব সমাজের মগজ ধোলাই করে ষড়যন্ত্র এগিয়ে নিচ্ছে ইউপিডিএফ ও বান্দরবান সীমান্তবর্তী মায়ানমানের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী কিছু গোষ্ঠী। গণমাধ্যমে নতুন করে নাম আসছে কেএনএফেরও।
মুলত ইউপিডিএফ ও কেএনএফের মধ্যে গোপন সমঝোতা হয় ২০২৫ সালের খাগড়াছড়ি ও রামসু বাজার সহিংসতার পর। কথিত ধর্ষণের ভুয়া স্লট তৈরি করে রাতারাতি জুম্ম ছাত্র জনতার ব্যানার দিয়ে মাঠে আন্দোলন গড়ানো হয়। এ ব্যানারের নেতৃত্বে উক্যনু মারমা সামনে আসেন। মারমা ছাত্র সংগঠন বিএমএসসির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকা উক্যনু মারমা ও সাচিং মারমার সাথে ইউপিডিএফ সম্পৃক্ততা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় স্পষ্ট প্রমাণ থাকলেও প্রশাসন উল্টো তার সাথে বসে বৈঠক করে। যা লুপে নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার সুযোগ নেয় ইউপিডিএফ। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর উক্যনু মারমার নির্দেশে ও ইউপিডিএফর উস্কানীতে গুইমারার রামসু বাজারে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। যা দিয়ে শুরুতে ইউপিডিএফ ট্রাম্প কার্ড খেলার চেষ্টা করলেও তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য প্রমাণ বেরিয়ে পড়লে উক্যনু সহ বাকিরা আড়ালে চলে যায়। পরবর্তীতে এ সুযোগ তুলে নেয় মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী।
কেএনএফ, ইউপিডিএফ ও উক্যনু মারমাসহ কয়েকজনের মধ্যস্থতায় বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে ঐ পাড়ে গিয়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে যোগ দিয়েছে অন্তত অর্ধশত মারমা যুবক।
বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারা থেকে এসব তরুণ ও যুবকরা বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় গেছেন। মূলত, খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারার ঘটনায় মামলা হওয়ার পর যৌথ অভিযান শুরু হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার কথা বলে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়। তারপর কৌশলে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। সশস্ত্র এসব তরুণদের এখন আবার পাহাড়ে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেএনএফ-ইউপিডিএফসহ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এ অপতৎরতা চালাচ্ছে। (সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানে এক সেনা অভিযানে কেএনএফ-ইউপিডিএফ সমঝোতা ও যৌথভাবে সশস্ত্র তৎপরতার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে)
এদিকে, খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারা থেকে মারমা যুবকরা ঘর ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানা গুলোতে কোন জিডির ঘটনাও নেই। মূলত নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাসে তাদের এ ফাঁদে ফেলা হয়।
গুইমারা ও খাগড়াছড়ি সদরের ঘটনায় গেল অক্টোবর মাসে দুই থানায় তিনটি মামলা হলেও তার কোন অগ্রগতি নেই। ধরা ছোয়ার বাইরে জুন্ম ছাত্র জনতা তথা ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা। আর উক্যনু-সাচিংরা নতুন করে ষড়যন্ত্রের ছক আঁকছেন পাহাড়ে।
এ বিষয়ে জানতে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো: মোরতোজা আলী খাঁনকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি জানান, তিনি খাগড়াছড়িতে যোগদান করেছেন তিন মাস আগে। মামলার বিষয়ে তিনি খুব একটা ওয়াকিবহাল না। এছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে মারমা যুবকদের মিয়ানমারে প্রশিক্ষণের বিষয়টিও তার জানা নেই বলে জানান। এসময় তিনি খাগড়াছড়ি সদর থানা ও গুইমারা থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
পরে গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারী নম্বরে কল করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায় নি, আর খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কল রিসিভ করেন নি।
বিএমএসসির ইউপিডিএফ সংযোগ
এদিকে মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। নিজেদের সংগঠনের আড়ালে খাগড়াছড়ি-গুইমারায় অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করা সংগঠনটির বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো; তারা বিভিন্ন দুর্গম এলাকার স্কুলগুলোকে টার্গেট করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার নামে ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন পিসিপির জনবল তৈরী করছে, শক্তিশালী নতুন প্রজন্ম তৈরী করছে ইউপিডিএফের জন্য। শুরুতে বিএমএসসির সদস্য বানিয়ে তারা তরুন প্রজন্মকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় করে তোলে, ধীরে ধীরে তাদের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের কথা বলে উদ্বুদ্ধ করে ঠেলে দেয়া হয় পিসিপি ও ইউপিডিএফের জালে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সাবেক এক নেতা সাউথইস্ট এশিয়া জার্নালকে জানান, উক্যনু, সাচিংসহ কিছু স্বার্থান্বেষী যুবকের প্রতারণার কারনে সামাজি সংগঠন বিএমএসসি এখন পুরো বিপথে চলে গেছে। মারমাদের অনেকেই বিষয়ে অবগত হলেও পিসিপি ও ইউপিডিএফের ভয়ে মুখ খুলছেনা।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের খাগড়াছড়িতে কথিত ধর্ষনের ঘটনা ছাড়াও খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পিসিপির ও ইউপিডিএফের পাশাপাশি বিএমএসসির দায়ও কম ছিলো না।
‘মারমাদের পাহাড়ে শান্ত ও শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে একটা পরিচয় থাকলেও সাম্প্রতিক বিএমএসসির এসব কর্মকান্ডের কারনে জাতি হিসেবে আমরা সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসীর তকমা নিতে হয়েছে’ বলেও জানান এই মারমা নেতা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশীরভাগ মারমা শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার দ্বারে পৌঁছাতে না পারাই এসব অপকর্মে লিপ্ত হবার কারন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সরকার ও নিরাপত্তাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা নিয়ে যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় তারা পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতির এসব দিক নিয়ে কথা বলেনা। এমনকি জাতিকে একটি বিপথ থেকে ফেরানোর কোন প্রচেষ্টাই তাদের নেই। আর যারা অর্থকষ্ট কিংবা দুর্গমতার কারনে পিছিয়ে পেড়েছে উচ্চ শিক্ষা থেকে তাদেরকেই ব্যবহার করছে বিএমএসসি, পিসিপি ও ইউপিডিএফ। নানা প্রলোভন ও সুদিনের লোভ দেখিয়ে তাদের বিপথে পরিচালিত করা হচ্ছে।
আর যেসব মারমা নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে পাহাড়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিংবা জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছেন তারাও আঞ্চলিক সশস্ত্র রাজনীতিতে নিজ জাতির গণহারে অংশগ্রহন কিংবা বিপথে পরিচালিত হবার বিষয়ে ততটা মাথাব্যাথা নেই।
মারমা নেতৃবৃন্দের সশস্ত্রগোষ্ঠী সংযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়িতে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে এক মারমা নেতার নাম উঠে আসছে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে। যার বিরুদ্ধে আবার রয়েছে মগ লিবারেশন আর্মি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেয়ার তালিকায়।
সূত্র বলছে, খাগড়াছড়িতে চাকমাদের টেক্কা দিতে মারমাদের একটা উগ্রবাদী ও উচ্চাভিলাষী অংশ বেশ ক বছর আগে সংগঠিত হতে গিয়ে আরাকান আর্মির সহযোগিতা চায়। এভাবেই তারা নজরে আসে এবং তৈরি হয় পরস্পরের কানেকশন।পুরো বৃহত্তর চট্টগ্রাম গিলে ফেলার অলীক স্বপ্নে বিভোর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দখলদার আরাকান আর্মি বাহিনী তাদের লুফে নেয়। এর মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মি বান্দরবানের পর খাগড়াছড়িতেও তাদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার শুরু করেছে। তারা বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি উভয় জেলায় মার্মা সার্কেল তথা কথিত মগ রাজার অস্তিত্বের ইতিহাস দিয়ে মাঝে থাকা চাকমাদের চ্যাপ্টা করার পরিকল্পনা করছে।
সরকারি চাকরির আড়ালে এতদিন প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন ওই মারমা নেতা। ধীরে ধীরে তার নেতৃত্বে গোপনে আরাকান আর্মির আর্থিক সহায়তায় শক্তিশালী হচ্ছে এই সশস্ত্র সংগঠনটি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তারা তাদের সংগঠিত হবার বিষয়টি খাগড়াছড়িতে জানান দিলেও সরকার অনুমানই করতে পারেননি।
এর আগে, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর সিন্দুকছড়ি জোনের একটি সফল অভিযানে ওই মগ পার্টির ৫ সন্ত্রাসীকে বিপুল পরিমাণ গোলা-বারুদসহ মানিকছড়ির বটতলী এলাকা থেকে আটক করা হয়।
২০২৫ সালের গুইমারার রামসু বাজারের ঘটনায় জুন্ম ছাত্র জনতা, বিএমএসসি, পিসিপি, ইউপিডিএফের সাথে এই সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরাও যোগ দিয়েছিলো বলে সূত্র জানায়।
সূত্রের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সুবাতাসে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে আরাকান আর্মির দেওয়া সহযোগিতা থেকে কোটি কোটি টাকা ছিটাচ্ছেন খাগড়াছড়ির সেই আরাকান আর্মির এজেন্ট মারমা নেতা। আওয়ামী লীগের সময়ে, ঠিক যেভাবে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিদ্রোহী গ্রুপ এনএলএফটি (NLFT) বাহিনীর সহায়তায় কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা উঠে এসেছিলেন।
একসময়, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সামান্য কর্মচারী ছিলেন। এনএলএফটিকে রসদ সর্বরাহ এবং সহযোগিতা করতে করতে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন ভারতীয় ত্রিপুরার বিদ্রোহী বাহিনী এনএলএফটির অর্থে। তারপর রাজনৈতিক বড় অবস্থানে আসেন— প্রথমে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, এরপর এমপি এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগের পতনের আগে পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে, সেই ছক মাথায় নিয়ে আগাচ্ছেন খাগড়াছড়ির উল্লেখিত মারমা নেতাটিও। তিনি ইতিমধ্যে যেমন বিএনপির রাজনীতির কাছাকাছি অবস্থান করছেন, তেমনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারেরও খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন বলে কানাঘুষা চলছে।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ পাহাড়ে নতুন কোনো সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে কি না—সে বিষয়ে কথা হয় দীর্ঘদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কর্মরত সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ এইচ এম ফারুকের সাথে।
আরাকান আর্মির অনুপ্রবেশ এবং স্থানীয় যোগসাজশের বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ছয়টি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন এবং প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা এজেন্টের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমারের উগ্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’। রাজনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের মার্মা সম্প্রদায় ৩ থেকে ৪টি গ্রুপে বিভক্ত হলেও, জাতিগত সমতা বা আনুকূল্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বার্মিজ মগদের এই বাহিনী।
তারা ‘মগ পার্টি’র আড়ালে পাহাড়জুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্থানীয় কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক মার্মা নেতা এই আরাকান আর্মির কাছ থেকে অর্থ ও অস্ত্রের অবৈধ যোগান নিয়ে গোপনে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াচ্ছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে—যা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি।- যোগ করেন তিনি।
বিগত কিছু সহিংসতার উদাহরণ টেনে ফারুক বলেন, গত বছর খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারায় সংগঠিত দাঙ্গা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সেনাবাহিনীর ওপর হামলার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে এর নেপথ্যে কারা ছিল। নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে যে, আরাকান আর্মির আস্থা অর্জন এবং নিজেদের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা জানান দিতেই মার্মাদের একটি উগ্রপন্থী গ্রুপ সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা ও বিশৃঙ্খলা ঘটিয়েছে।
আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপগুলো মূলধারার রাজনীতিকে কীভাবে ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে এএইচ এম ফারুক জানান, অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রকরা এখন বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ মূলধারার জাতীয় রাজনীতি এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের আড়ালে নিজেদের সংগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত করছে।
আসছে সেপ্টেম্বরে নতুন কোনো সংঘাত অপেক্ষা করছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাহাড়ে ইস্যু তৈরির চেষ্টায় সবসময়ই থাকে দেশি-বিদেশি চক্র, আঞ্চলিক সংগঠন এবং তাদের উপদলগুলো। তারা মূলত বছরের ৩টি নির্দিষ্ট সময়কে টার্গেট করে; বছরের শুরুতে নববর্ষ বা পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’-র সময়কে তারা বেছে নেয়। সামনে আসছে ধর্মীয় উৎসব ‘কঠিন চীবর দান’-এর মৌসুম (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)। এই সময়ে পাহাড়ের ধর্মীয় আবেগ ও জমায়েতকে কাজে লাগিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হতে পারে এবং বছরের শেষভাগে যখন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উপজাতি শিক্ষার্থীরা ছুটিতে পাহাড়ে আসেন, তখন আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক এসব শিক্ষার্থীর মগজ ধোলাই করে এই সময়েই তাদের মাঠে নামিয়ে ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটানো হয়।
সাম্প্রতিক কয়েকবছরের ঘটনা পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে, ইউপিডিএফ এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সুপরিকল্পিতভাবে মারমা নিয়ন্ত্রিত এলাকার নারী ও স্কুলগামী কোমলমতি শিশুদের বিভিন্ন পন্থায় তাদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে পার্বত্যাঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটনের লক্ষ্যে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন অস্ত্রসহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
২০২৪ সালে দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি আর ২০২৫ সালের খাগড়াছড়ি ও গুইমারার ঘটনাকে পুঁজি করে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটনের বিষয়টি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ পুণরায় বীজ বপণ করছে বলেই প্রতীয়মান। মিয়ানমারে সশস্ত্র প্রশিক্ষন নেয়া মারমা তরুণদের দেশে ফেরত আসার বিষয়টি অনুধাবন তরে আসছে সেপ্টেম্বর সামনে রেখে নতুন করে সশস্ত্র তৎপরতার আভাস মিলছে নানা কর্মকান্ডে। এই সময়ে নিরাপত্তাবাহিনী, স্থানীয় পার্বত্যবাসী তথা সরকারের আগাম সতর্কতার বিকল্প নেই।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।