দুর্গম পাহাড়ে যাতায়াত সুবিধায় সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন ও ১৭ ইসিবি’র উদ্যোগে চাঁদের গাড়ি ও নৌকা সেবা চালু
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্যাঞ্চলের দুর্গম জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে আবারও মানবিক ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের নজির স্থাপন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ, সহজ ও নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন ও ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের (১৭ ইসিবি) যৌথ উদ্যোগে একটি চাঁদের গাড়ি ও একটি নৌকা সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
রোববার (২ আগস্ট) বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বহুদিনের প্রত্যাশিত এ সেবার কার্যক্রম শুরু হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার দুর্ভোগে থাকা পোয়ামহুরী, পাহাড়ভাঙ্গা ও সিন্দুমুখ এলাকার হাজারো মানুষের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি এসব এলাকার মানুষ নির্ভরযোগ্য যানবাহন ও নৌযানের অভাবে নানামুখী দুর্ভোগের শিকার হয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোত এবং দুর্গম পাহাড়ি পথের কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ত। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে বিলম্ব হওয়ায় জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি হতো। পাশাপাশি কৃষকদের অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হতো, যা তাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিত।
স্থানীয়দের মতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ শুধু একটি যানবাহন বা নৌকা চালু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দুর্গম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান আশিক। বিশেষ অতিথি ছিলেন ১৭ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুবায়ের আল হাসান।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুরুল আলম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুলসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দা।
আয়োজকরা জানান, উদ্বোধন করা চাঁদের গাড়িটি প্রতিদিন আলীকদম–পোয়ামহুরী–আলীকদম রুটে দুইবার নিয়মিত চলাচল করবে। একই সঙ্গে নৌকাটি পোয়ামহুরী–পাহাড়ভাঙ্গা–সিন্দুমুখ নৌপথে নিয়মিত সেবা প্রদান করবে।
এর ফলে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হবে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাতকরণ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক গতি সঞ্চার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান আশিক বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের কল্যাণে নিবেদিত। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যার বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই সেবাদ্বয় স্থানীয় জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। তারা বলেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে এ উদ্যোগ পাহাড়ি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করে তুলবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয়দের মতে, পার্বত্যাঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করেছে। দুর্গম এলাকায় জনবান্ধব ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনী যে জনকল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে, এই উদ্যোগ তার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যোগাযোগব্যবস্থার এই নতুন সংযোজন শুধু যাতায়াত সহজ করবে না, বরং পার্বত্যাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয়রা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।