খাগড়াছড়িতে এক স্বর্ণকারের ফাঁদে নিঃস্ব অর্ধশতাধিক পরিবার, প্রতিকারের আকুতি ভুক্তভোগীদের

খাগড়াছড়িতে এক স্বর্ণকারের ফাঁদে নিঃস্ব অর্ধশতাধিক পরিবার, প্রতিকারের আকুতি ভুক্তভোগীদের

খাগড়াছড়িতে এক স্বর্ণাকারের ফাঁদে নিঃস্ব অর্ধশতাধিক পরিবার

ছবি- খাগড়াছড়ি বণিক লাইনের জুয়েলার্স দোকানের ফাইল ছবি।

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা সদরে সঞ্জিব বণিক নামে এক স্বর্ণকারের বিরুদ্ধে বিপদগ্রস্ত মানুষের আর্থিক দুরবস্থাকে পুঁজি করে উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেন, খালি চেক ও জমির দলিল রেখে পরে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি এবং আদালতে মামলা করে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।

এ স্বর্ণকারের সাথে আর্থিক লেনদেন করে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষ মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে স্বর্ণ বন্ধক রাখার কোন নির্দিষ্ট আইন না থাকা এবং মানুষের বিপদকে পুঁজি করে এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন খাগড়াছড়ি বাজারের এ স্বর্ণকার ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন মহলে বিচার দিলেও প্রতিকার পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশে স্বর্ণ বন্ধক রেখে অর্থ লেনদেনের জন্য সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো না থাকায় সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে উচ্চ সুদে অর্থ ঋণ দিয়ে আসছেন ওই ব্যবসায়ী। ঋণ দেওয়ার সময় স্বর্ণালঙ্কার, জমির দলিল ও ব্যাংকের খালি চেক গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে সুদসহ টাকা পরিশোধের পরও বন্ধকী সম্পদ ফেরত না দিয়ে উল্টো বড় অঙ্কের টাকার দাবি এবং আদালতে মামলা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

এমনই কয়েকজন ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে জানা যায় সঞ্জিব বনিকের আরও অনেক অপকর্মের কথা।

খাগড়াছড়ি সদরের গঞ্জপাড়া এলাকার বাসিন্দা মনিকা রাণী দাশ বলেন, পারিবারিক প্রয়োজনে মা বাবার রেখে যাওয়া বসত ভিটার দলিল বন্ধক রেখে সঞ্জিব বনিকের কাছ থেকে এক লাখ টাকার ঋণ নেন দুই বোন। টাকা নেওয়ার সময় দলিলের সাথে একটি খালি ব্যাংক চেক রাখা হয়।

তার ভাষ্য, ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধের পর লেনদেন পুরোপুরি মিটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে হিসাব করতে গেলে সঞ্জিব ৭ লাখ টাকার চেক দেখিয়ে টাকা দাবি করেন।

মনিকা বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি। শেষ পর্যন্ত বাবা-মায়ের শেষ স্মৃতি বসতভিটা বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। দলিল ফেরত পেলেও মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলেও আমাকে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমার পরিবার সঞ্জিবের এ ফাঁদ থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রের সহযোগিতা চায়।

খাগড়াছড়ি সদরের ঠাকুরছড়া এলাকার বাসিন্দা টিপু ত্রিপুরা জানান, স্বর্ণ বন্ধক রেখে সঞ্জিব বনিকের দোকান থেকে দুই দফায় দুই লাখ ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। লেনদেনের সময় তার কাছ থেকেও দুটি ব্যাংক চেক নেওয়া হয়।

তার দাবি, সুদ-আসল মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিশোধের পরও বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং অতিরিক্ত ৬০ হাজার টাকা দিয়ে স্বর্ণ ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তা দিতে অস্বীকার করে দুটি চেকের বিপরীতে ৪৭ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টিপু ত্রিপুরা বলেন, ‘এত টাকা দিতে না পারায় আদালতে মামলা করা হয়েছে। বিভিন্ন সালিশ-বৈঠকে মামলা তুলে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তা করা হয়নি। উল্টো বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

আরেক ভুক্তভোগী আসমা বেগম অভিযোগ করেন, আর্থিক সংকটে ৬ ভরি স্বর্ণ বন্ধক রেখে তিনি টাকা নিয়েছিলেন। পরে সুদসহ সব টাকা পরিশোধ করলেও তার বাসা থেকে চুরি হওয়া চেকবইয়ের পাতাকে ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও এক ভুক্তভোগী বলেন, সঞ্জিব বণিক নিজের মনগড়া নিয়মে উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে থাকেন। তার সাথে কেউ একবার লেনদেনে জড়ালে সে আর রেহাই পায় না, নানা জটিলতায় পড়তে হয়। তার নির্যাতন ও লোভ থেকে নিজের আত্মীয় স্বজনও বাদ পড়েনি। তার টাকার কাছে যেন সবাই জিম্মি। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতিসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী সঞ্জিব বণিক মুঠোফোনে বলেন, তিনি ব্যবসায়িক কারণে এ সব লেনদেন করেছেন। কাউকে জোর করে টাকা দেননি। এখন টাকা আদায় করতে গিয়ে তিনি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অভিযোগ করে বিস্তারিত জানতে হলে তার আইনজীবীর সাথে কথা বলতে বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে স্বর্ণ বন্ধক রেখে অর্থ ঋণ দেওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবৈধ সুদি কারবার বা দাদন ব্যবসা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় এ কারবার চলছে, আর উচ্চ হারের সুদ কারবারের লেনদেনে জড়িয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার।

এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *