জামিনে মুক্ত হলেন রমজান আলীর বদলে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ভোগ করা সোনামিয়া
![]()
কক্সবাজার প্রতিনিধি
অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন কক্সবাজারের আলোচিত ব্যক্তি মুহাম্মদ ইয়াসিন ওরফে সোনামিয়া। তিনি রমজান আলীর বদলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাভোগ করছিলেন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় আদালতের নির্দেশে চারটি শর্তে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে তার স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তিনি কক্সবাজার জেলা কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সেলে ছিলেন।
সোনামিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান জানান, আদালত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, সোনামিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে যাকে আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তিনি এই সোনামিয়া নন। তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। এ বিষয়ে সোনামিয়ার মুক্তি চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আবদুর রহিম বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে চারটি শর্তে তার জামিন ও মুক্তির আদেশ দেন।
শর্তগুলো হলো, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশ্লিষ্ট থানায় জমা রাখা, আদালতের অনুমতি ছাড়া ঠিকানা পরিবর্তন না করা, নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজিরা বা রিপোর্ট করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত রাখা।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালে ডিবি পুলিশের অভিযানে রমজান আলীসহ পাঁচজনকে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ওই মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নামটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির সূত্র ধরে এ নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে ওই সময়ের ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২ নম্বর আসামির প্রকৃত নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ নামে একজন কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান এবং পরে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ওই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একটি দল ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে মুহাম্মদ ইয়াসিন ওরফে সোনামিয়াকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠায়। কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যে তিনি জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে দাবি করেন, তিনি এ মামলার আসামি নন।
পরে জেল সুপার বিষয়টি জেলা জজ আদালতের নজরে আনলে আদালত তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ তদন্ত করে গত ২ জুলাই প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডের ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার হওয়া সোনামিয়া একই ব্যক্তি নন। তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রথমে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম ছিল রমজান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, তৎকালীন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মানস বড়ুয়া বলেন, গ্রেপ্তারের পর আসামির নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য কক্সবাজার সদর থানায় পাঠানো হলে পুলিশ জানায়, দেওয়া পরিচয় সঠিক নয়। পরে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করেও গ্রেপ্তার ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, “এ কারণে অভিযোগপত্রে আমি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলাম যে দ্বিতীয় আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আটক রাখার আবেদনও জানিয়েছিলাম।”
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়াদুর রহমান বলেন, কারাগারে কোনো বন্দিকে গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রই মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ মামলায়ও আদালতের নথিতে যে পরিচয় ছিল, সেই পরিচয় অনুযায়ী বন্দিকে কারাগারে গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আদালত থেকে যে নথি ও আদেশ আসে, সেটির ভিত্তিতেই একজন বন্দিকে কারাগারে গ্রহণ করা হয়। কারাগারের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো মামলার আসামির পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ নেই।”
তবে পরে বন্দির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় বলে জানিয়ে তিনি বলেন, বন্দি গ্রহণের সময় পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, কারাগারে যাওয়ার দুই দিন পর সোনা মিয়া নিজেকে এ মামলার আসামি নন বলে জেল সুপারকে জানান। পরে জেল সুপার বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে তদন্ত শুরু হয়।
ওসি বলেন, “যদি গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া হন, তাহলে গ্রেপ্তারের সময়ই তিনি নিজের পরিচয় নিয়ে আপত্তি তুললেন না কেন এ প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে।”
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, গত ১২ আগস্ট আদালত তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হন যে, বর্তমানে কারাগারে থাকা মুহাম্মদ ইয়াসিন প্রকাশ সোনামিয়া ওই মামলার প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। অন্য কোনো মামলায় অভিযুক্ত না থাকায় আদালত চারটি শর্তে তাঁর মুক্তির আদেশ দেন।
তিনি জানান, আদালতের শর্ত অনুযায়ী সোনামিয়াকে বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তন করা যাবে না, আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া জেলা শহর বা দেশ ত্যাগ করা যাবে না, তার মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা পাসপোর্ট কক্সবাজার সদর মডেল থানায় জমা রাখতে হবে এবং প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট থানায় উপস্থিত হয়ে হাজিরা দিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার দ্বিতীয় আসামি হিসেবে সোনা মিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তদন্ত চলাকালে তার নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া।
পরে বিচার শেষে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত নূর মোস্তফা ও সোনা মিয়া নামে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড, আবদুল গফুর ও মো. আইয়ুব ওরফে তৈয়বকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আবদুর রহমানকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেন। পরবর্তীতে রায়ের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হওয়া মুহাম্মদ ইয়াসিন ওরফে সোনামিয়া দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। তদন্তেও প্রাথমিকভাবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও বর্তমানে আটক হওয়া ব্যক্তি ভিন্ন বলে উঠে আসে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।