দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত মিয়ানমার: মিন অং হ্লাইং
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার ‘বিশ্বস্ত মিত্র’ হিসেবে মিয়ানমার সবসময় পাশে থাকবে এবং রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করতে প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সামরিক জান্তা ও স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ অঙ্গীকার করেন।
মঙ্গলবার মস্কোর ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন মিন অং হ্লাইং। এপ্রিলে নিজেকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পর এটিই ছিল তার প্রথম মস্কো সফর। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে মিন অং হ্লাইং বলেন, মিয়ানমারের বর্তমান উন্নয়নে রাশিয়ার সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে মিয়ানমার ভবিষ্যতেও দেশটির পাশে থাকবে বলেও তিনি জানান।
দুই দেশের নেতারা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের পর দুই নেতার উপস্থিতিতে বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস, টেলিযোগাযোগ, স্যাটেলাইট নেভিগেশন এবং মহাকাশ সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১২টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়।
পুতিন বৈঠকের শুরুতে মিন অং হ্লাইংকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পুনরায় রপ্তানির জন্য রাশিয়া থেকে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এ ছাড়া মিয়ানমারে রাশিয়ার সহযোগিতায় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দাওয়েই এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করেন পুতিন।
বর্তমানে মিয়ানমার তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সঙ্গে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে রাশিয়ার সহযোগিতা দুই দেশের জন্যই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রাশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার প্রবেশাধিকার আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২১ সালে মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই রাশিয়া মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক সহযোগিতা দেয়। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো মিন অং হ্লাইং ও তার সরকারের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
মিন অং হ্লাইং এ পর্যন্ত ১৪ বার রাশিয়া সফর করেছেন। এর মধ্যে সামরিক অভ্যুত্থানের পরই তিনি ছয়বার রাশিয়া সফর করেন। পুতিনের সঙ্গে প্রতিটি বৈঠকেই তিনি রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং দেশটির নেতৃত্বের প্রশংসা করে আসছেন।
এর আগে এক সফরে মিন অং হ্লাইং রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ‘বিশ্বনেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এমনকি মিয়ানমার ও রাশিয়ার বর্তমান জোটকে বুদ্ধের সময়কার ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে তুলনা করে বিতর্কিত মন্তব্যও করেছিলেন তিনি।
রাশিয়ার দৃষ্টিতেও মিয়ানমার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। তবে মিয়ানমারে রাশিয়ার বিনিয়োগ এখনো চীনের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে রাশিয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান সহযোগিতা মূলত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি, অবকাঠামো, পারমাণবিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে মিয়ানমার ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে মিয়ানমারকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে মস্কো।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।