সাজেকে টানা অবরোধ ও খাদ্য সংকট: একপক্ষীয় শর্তে কি মিলবে স্থায়ী শান্তি?
![]()
মো. আবদুর রউফ
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় ও সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে টানা সড়ক অবরোধের ফলে সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবাধিকারের এক গভীর সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পারস্পরিক বিরোধ, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত দুর্ভোগ আজ এমন এক জটিল মোড়ে এসে উপনীত হয়েছে, যেখানে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত বা একপক্ষীয় পদক্ষেপ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে চলা এই দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সশস্ত্র পক্ষকে সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিতর্কিত শর্ত। পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার ও প্রকোষ্ঠগত সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস থেকে এই দাবির জন্ম হলেও, কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে প্রতিহত বা বিতাড়িত করার পূর্বশর্তে সড়ক অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি চালিয়ে গিয়ে সাধারণ জনজীবনকে জিম্মি করা কোনো সুস্থ সমাজের নীতি হতে পারে না।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আন্দোলনকারী নেতাদের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে পারস্পরিক আলোচনার একটি ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল। ওই সংলাপে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত পাঁচটি যৌক্তিক ও অযৌক্তিক দাবির মধ্যে চারটি বিষয়েই ফলপ্রসূ সমঝোতা অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু কেবল একটিমাত্র শর্ত- অর্থাৎ সাজেকে অবস্থানরত জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে সরিয়ে দেওয়ার একগুঁয়েমি শর্তের কারণে পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটি মাঝপথে থমকে গেছে। পাহাড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস দমন এবং সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার মূল দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের নিজস্ব বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রেসক্রিপশন বা শর্তের ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালিত হতে পারে না।
তা ছাড়া, পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনীতি ও সমীকরণ এতটাই স্পর্শকাতর যে, এক পক্ষের দাবির মুখে প্রশাসন যদি অন্য কোনো সশস্ত্র পক্ষকে হটাতে বা দমন করতে যায়, তবে তার প্রতিক্রিয়ায় অন্য পক্ষ আরও হিংসাত্মক ও রক্তক্ষয়ী পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে। এর ফলে সাজেক তথা পুরো পাহাড়ি জনপদ এক দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বগ্রাসী গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, যা কোনোভাবেই একটি স্থিতিশীল অঞ্চলের পরিচয় বহন করে না।
এই টানা ও অন্তহীন অবরোধের সবচেয়ে নির্মম ও সরাসরি শিকার হচ্ছে সাজেক এলাকার সাধারণ, শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ মানুষ। পর্যটন মৌসুমের ভরা সময়ে এভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কারণে সাজেকের অর্থনীতি আজ পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ি ও বাঘাইহাটের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পাহাড়ি এই দুর্গম জনপদে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক ও খাদ্য সংকট। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো আজ চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাজারগুলোর খুচরা দোকানগুলোতে চাল, ডাল, তেল, লবণ ও শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তাকগুলো আজ একেবারে শূন্য। সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার কারণে মুষ্টিমেয় কিছু দোকানে যেটুকু পণ্য অবশিষ্ট রয়েছে, তার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বহু বাইরে চলে গেছে। কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন পাহাড়ি ও বাঙালি খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল পরিবহনশ্রমিকেরা। তিন বেলা অন্ন জোগাড় করতেই যেখানে তাদের এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
শুধু তাই নয়, আকস্মিক কোনো রোগ বা জরুরি চিকিৎসা সেবা পাওয়ার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার পথে রোগী পরিবহনের পথটুকুও যখন বন্ধ থাকে, তখন তা এক অমানবিক যন্ত্রণার রূপ নেয়। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে বা তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার বঞ্চিত করে কোনো দিনই প্রকৃত বা স্থায়ী শান্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।
পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর একক, পক্ষপাতদুষ্ট বা একপক্ষীয় দাবি পূরণের মধ্য দিয়ে কখনোই মসৃণ হতে পারে না। এর একমাত্র কার্যকরী ও বাস্তবসম্মত সমাধান নিহিত রয়েছে একটি নিরপেক্ষ, কঠোর এবং সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
প্রথমত, পাহাড়ে সক্রিয় সকল আঞ্চলিক দলের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে রাষ্ট্রকে কোনো আপস না করে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, দলমত নির্বিশেষে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জবরদস্তির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া প্রতিটি সংঘাত, হামলা বা বিশৃঙ্খলার পেছনে থাকা প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কোনো পক্ষকে রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক প্রভাবে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে জনগণের মৌলিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব সাজেকে চলমান এই আত্মঘাতী সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক যান চলাচল ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাজেকের সর্বস্তরের জনগণের আন্তরিক ও দায়িত্বশীল সংলাপের মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ে হানাহানি ও রক্তপাতের অবসান ঘটিয়ে একটি স্থায়ী ও প্রীতিময় সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
মো. আবদুর রউফ, সাংবাদিক, পার্বত্য চট্টগ্রাম।