পেকুয়ার সড়ক ও খালের পাড়ে উধাও গাছপালা, ছায়াহীন পথে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

পেকুয়ার সড়ক ও খালের পাড়ে উধাও গাছপালা, ছায়াহীন পথে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

পেকুয়ার সড়ক ও খালের পাড়ে উধাও গাছপালা, ছায়াহীন পথে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও খালের পাড় থেকে ক্রমেই কমছে গাছপালা। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে অনেক এলাকায় হারিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের ছায়াঘেরা পরিবেশ। এতে তীব্র রোদে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ পথচারীরা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি সড়ক ও খালের পাড়ের গাছ ব্যক্তিগত সম্পত্তি দাবি করে একটি মহল কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ এবং নতুন করে বৃক্ষরোপণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগও যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। এমন পরিস্থিতিতে সড়ক ও খালের পাড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পেকুয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পাহাড়ঘেঁষা হওয়ায় এখানে প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। পাখির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকেও বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিকভাবে গাছ জন্মায়। একসময় উপজেলার গ্রামীণ ও প্রধান সড়কগুলোর দুই পাশে সারি সারি ছায়াদার গাছ ছিল। এসব গাছের ছায়ায় শিক্ষার্থীরা স্বস্তিতে বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াত করতে পারত। মাঠে কাজ করা কৃষকেরাও ক্লান্তির পর গাছতলায় বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে সেই সবুজ পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও খালের পাড় ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোথাও সড়কসংলগ্ন এবং খালের পাড়ের বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কসংলগ্ন জমি কিংবা খালের ওপারে জমি ও বাড়িঘর রয়েছে—এমন কিছু ব্যক্তি সরকারি জায়গার গাছ নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে কেটে বিক্রি করছেন। গাছের মালিকানা ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা না করে অপরিণত গাছও কেটে ফেলার প্রবণতা রয়েছে। ফলে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হারাচ্ছেন প্রাকৃতিক ছায়া। এসব এলাকায় নতুন করে গাছ লাগানো এবং বিদ্যমান গাছ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

গাছের ছায়া কমে যাওয়ায় গরমের দিনে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াতের সময় তাঁদের দীর্ঘ পথ তীব্র রোদের মধ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে। সব সময় যানবাহন পাওয়া যায় না বলে অনেক শিক্ষার্থীকে হেঁটে কিংবা সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে প্রচণ্ড গরমে তাদের শারীরিক কষ্টও বাড়ছে।

শিলখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াজ অভিযোগ করে বলেন, খালের পাড়ে থাকা বড় বড় গাছের মধ্যে বেশ কয়েকটি গাছ স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি কেটে ফেলেছেন। গাছগুলো এলাকাবাসীকে ছায়া দিত। তাঁর অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ওই পথ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করলেও গাছ কাটার ঘটনা দেখেও কোনো প্রতিবাদ করেননি।

পেকুয়ার সড়ক ও খালের পাড়ে উধাও গাছপালা, ছায়াহীন পথে ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

পহরচাঁদা ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মুজাহিদ বলেন, তাঁর বাড়ি থেকে মাদ্রাসার দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। সড়কের পাশে পর্যাপ্ত গাছ না থাকায় তীব্র রোদের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে মাদ্রাসায় যাতায়াত করতে কষ্ট হয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে দুই কোটি গাছ লাগানোর কথা বলছেন। অথচ পেকুয়ার সড়কগুলোর পাশে পর্যাপ্ত গাছ লাগানো হয়নি।

একই মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল মাওয়া বলেন, তাঁর বাড়ি থেকে মাদ্রাসার দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। যাওয়ার সময় গাড়ি পাওয়া গেলেও ফেরার পথে অনেক সময় গাড়ি পাওয়া যায় না। তখন তীব্র রোদের মধ্যে হেঁটে বাড়ি ফিরতে খুব কষ্ট হয়।

শিলখালী উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অহিন বলে, তীব্র রোদের মধ্যে স্কুলে যেতে কষ্ট হয়। সব সময় গাড়িও পাওয়া যায় না। তাই সরকারের উচিত রাস্তার দুই পাশে গাছ লাগানো।

এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার সড়কের দুই পাশে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাঁরা গাছ কেটেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

পেকুয়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী রবিউল হোছাইন বলেন, নতুন প্রকল্পগুলোতে সড়কের পাশে গাছ লাগানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়েরও নির্দেশনা আছে। এখন থেকে সড়ক সংস্কার ও নতুন সড়ক নির্মাণের সময় পাশে গাছ লাগানো হবে।

সড়কের পাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সংলগ্ন গাছ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, ইচ্ছেমতো গাছ কাটার নিয়ম নেই। গাছ কাটতে হলে বন বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। বন বিভাগ কোনো গাছকে পরিপক্ব হিসেবে চিহ্নিত করলে কেবল সেই গাছ কাটার সুযোগ রয়েছে। এলজিইডির অধীনে নির্মিত সড়কের পাশের গাছ কাটার ক্ষেত্রেও নিয়ম মানতে হবে। নিয়ম অমান্য করে গাছ কাটলে তা আইনবহির্ভূত হিসেবে বিবেচিত হবে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালের পাশে গাছ লাগানোর জন্য আলাদা কোনো বাজেট নেই। তবে খালের পাড়ের গাছ কেটে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের কাজে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অবশ্য উপজেলার সব খাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন নয় বলেও জানান তিনি।

পেকুয়ার বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খাইরুল আলম বলেন, চলতি অর্থবছরে সড়ক ও খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের বিষয়টি এলজিইডিকে দেওয়া হয়েছে। এলজিইডি সেখানে চারা রোপণ করলে বন বিভাগ চারা সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। রোপণ করা গাছের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণেও সহায়তা দেওয়া হবে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক ছায়া ফিরিয়ে আনা এবং জনদুর্ভোগ কমাতে পেকুয়ার সড়ক ও খালের পাড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সরকারি জায়গার গাছের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং রোপণ করা চারার পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে পেকুয়ার সড়ক ও খালের পাড়ে আবারও সবুজ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed