মুজিববর্ষের উপহার পেলো ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবার, ২০২২ সালের মধ্যে বাড়ি পাচ্ছে আরো এক লাখ গৃহহীন পরিবার - Southeast Asia Journal

মুজিববর্ষের উপহার পেলো ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবার, ২০২২ সালের মধ্যে বাড়ি পাচ্ছে আরো এক লাখ গৃহহীন পরিবার

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল দেশের কোনো মানুষ আশ্রয়হীন থাকবে না। পিতার সেই স্বপ্ন পূরণে মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশের গৃহহীন-ভূমিহীনদের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ৭০ হাজার ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার পেলো আধাপাকা বাড়ি। ২৩ জানুয়ারি শনিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের কাছে এসব বাড়ি হস্তান্তরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা, চাপাইনবাবগঞ্জ সদর, নীলফামারীর সৈয়দপুর ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাটসহ গণভবনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এবং সারাদেশের ৪৯২টি উপজেলা প্রান্ত ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিল। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই হবে মুজিববর্ষের লক্ষ্য, যাতে দেশের প্রতিটি মানুষ উন্নত জীবন-যাপন করতে পারেন। দেশের ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে ঘর দিতে পারার চেয়ে বড় কোনো উৎসব আর কিছুই হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এভাবেই মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সমগ্র বাংলাদেশের গৃহহীনদের নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করে দেয়া হবে, যাতে দেশের একটি লোকও গৃহহীন না থাকেন ও উন্নত জীবন-যাপন করতে পারেন। যাদের থাকার ঘর নেই, ঠিকানা নেই, আমরা তাদের যেভাবেই হোক একটা ঠিকানা নিশ্চিত করে দেব। শেখ হাসিনা বলেন, মুজিববর্ষের অনেক কর্মসূচি আমাদের ছিল। সেগুলো আমরা করোনার কারণে করতে পারিনি। তবে করোনা এক দিকে আশীর্বাদ হিসেবেও কাজ করেছে, কারণ আমরা গৃহহীনদেরকে ঘর করে দেয়ার দিকে বেশি নজর দিতে পেরেছি। ফলে আজ এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এরপরেও সীমিত আকারে আমরা করে দিচ্ছি এবং একটা ঠিকানা আমি সমস্ত মানুষের জন্য করে দেব। কারণ আমি বিশ্বাস করি যখন এই মানুষগুলো ঘরে থাকবে তখন আমার বাবা এবং মা- যারা সারাটা জীবন এ দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে গিয়েছেন, তাদের আত্মা শান্তি পাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদেরও কক্সবাজার এবং পিরোজপুরে আমরা ফ্ল্যাট করে দিয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদেরও ঘর করে দিয়েছি। তাদেরকে আরো ১শ’টি ভবন তৈরি করে দেয়া হবে। আজ এক লাখ ৬৬ হাজার ১৮৯টি ঘর করে দিলাম। শিগগিরই আরো এক লাখ ঘর করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, এই গৃহায়ন প্রকল্পে কোনো শ্রেণিকে বাদ দেয়া হয়নি; বেদে শ্রেণিকেও ঘর করে দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি হিজড়াদের স্বীকৃতি দিয়েছি এবং তাদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি, দলিত বা হরিজন শ্রেণির জন্য উচ্চমানের ফ্ল্যাট তৈরি করে দিচ্ছি। এরই মধ্যে চা শ্রমিকদের জন্য বাসস্থান তৈরি করে দিয়েছি। এভাবেই সমাজের প্রত্যেকটা শ্রেণির মানুষদের পুনর্বাসনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান করা হয় এবং ৩ হাজার ৭শ’ ১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে উপকারভোগীদের মাঝে বাড়ির চাবি এবং দলিল হস্তান্তর করেন সারাদেশের বিভিন্ন উপজেলার ইউএনও।

ভিডিও কনফারেন্সটি পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি পরিবেশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রাম, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুর গ্রাম, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনার জন্য কাজ করছেন। এজন্য ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরো এক লাখ বাড়ি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হবে। তিনি আরো বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৬ হাজার ১৮৯টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বাড়ি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। বিশ্বে এই প্রথমবারের মতো সরকারের পক্ষ থেকে একসঙ্গে এত ঘর ভূমিহীন ও গৃহহীনদের উপহার দেয়া হচ্ছে। ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নোয়াখালী জেলার (বর্তমানে লক্ষীপুর) চরপোরাগাছা গ্রাম পরিদর্শনকালে ভূমিহীন, গৃহহীন ও অসহায় লোকদেরকে পুনর্বাসনের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ড. কায়কাউস আরো বলেন, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প ৪ হাজার ৮৪০ দশমিক ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে (জুলাই ২০১০ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত) ২ লাখ ৫০ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার ও ছিন্নমূল পরিবারকে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত সারাদেশে ১ লাখ ৯২ হাজার ২২৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৪৮ হাজার ৫০০ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের প্রত্যেকের ১ থেকে ১০ শতাংশ ভূমি রয়েছে। কিন্তু তাদের বাড়ি করার সক্ষমতা নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু কক্সবাজারের খুরুশকুলে ৬০০ পরিবারের জন্য ২০টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ডিটেইল্ড প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) এর মাধ্যমে আরো ১১৯টি বহুতল ভবন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে।

উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীতে দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারকে পাকা ঘর উপহার দেয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যেই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় ধাপে আরো প্রায় এক লাখ পরিবারকে ঘর উপহার দেয়া হবে। শুধু ঘরই নয়, প্রতিটি ঘরে ব্যবস্থা করা হয়েছে বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানি। একই সঙ্গে এসব পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করা হবে। ভূমিহীন ও গৃহহীনদের আবাসনের আওতায় আনতে তিনটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ৪১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হয়েছে ২৪ হাজার ৫৩৮টি ঘর। এছাড়া দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ সহনশীল ঘর নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৬৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকায় ৩৮ হাজার ৫৮৬টি ঘর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের আওতায় ৫২ কোটি ৪১ লাখ টাকায় ৩ হাজার ৬৫টি ঘর নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পগুলোতে মোট ১ হাজার ১৬৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।