তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষমতার সংঘাত—বেরিয়ে এল বিবিসির অনুসন্ধানে

তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষমতার সংঘাত—বেরিয়ে এল বিবিসির অনুসন্ধানে

তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষমতার সংঘাত—বেরিয়ে এল বিবিসির অনুসন্ধানে
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বে গভীর মতপার্থক্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চিত্র উঠে এসেছে বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। বাইরের হুমকির বদলে সরকারের ভেতরের বিভক্তিই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

একটি গোপন অডিও বার্তার বরাতে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) বিবিসি জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারের একটি মাদ্রাসায় ভাষণ দিয়েছিলেন আখুন্দজাদা। ওই ভাষণে তাঁকে বলতে শোনা যায়—সরকারের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ একদিন পুরো ‘ইসলামি আমিরাত’-এর পতন ঘটাতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই বিভাজনের ফলেই আমিরাত ভেঙে পড়বে।’

আখুন্দজাদার এই বক্তব্য দীর্ঘদিনের একটি সন্দেহকে নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছে। অনেকেই সন্দেহ করেন—তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে আসলে দুটি ভিন্ন শক্তিকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। তবে তালেবান নেতৃত্ব বরাবরই এমন বিভক্তির কথা অস্বীকার করে এসেছে।

এদিকে বিবিসির আফগান সার্ভিস বিগত এক বছর ধরে বিষয়টির সত্যতা জানতে অনুসন্ধান চালিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি শতাধিক সাবেক ও বর্তমান তালেবান সদস্য, কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তালেবানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের স্পষ্ট কাঠামো চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।

এই বিষয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে এখন দুটি আলাদা শিবির রয়েছে। এই দুটি শিবিরের একদিকে রয়েছে কান্দাহারভিত্তিক আখুন্দজাদার অনুগত গোষ্ঠী, যারা একটি কঠোর, আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমে বিশ্বাসী। অন্যদিকে রয়েছে কাবুলভিত্তিক প্রভাবশালী মন্ত্রী, সামরিক নেতা ও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের একটি দল, যারা ইসলামি কাঠামোর মধ্যে থেকেও আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নারীদের শিক্ষার সুযোগ পুনর্বহালের পক্ষে।

তালেবানের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র এই দ্বন্দ্বকে আখ্যা দিয়েছেন—‘কান্দাহার হাউস বনাম কাবুল’। এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে, যখন আখুন্দজাদার নির্দেশে হঠাৎ করেই আফগানিস্তানজুড়ে ইন্টারনেট ও ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিন দিন পরেই অবশ্য কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আবারও ইন্টারনেট চালু করা হয়। বিবিসির অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাবুলভিত্তিক শীর্ষ মন্ত্রীরা আখুন্দজাদার আদেশ অমান্য করেই ইন্টারনেট পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তালেবানের ইতিহাসে এটি ছিল প্রায় নজিরবিহীন ঘটনা। কারণ এই সংগঠনের মূল নীতিই হলো নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। এক তালেবান সূত্র একে সরাসরি ‘বিদ্রোহ’ বলে অভিহিত করেছেন।

শুরুর দিকে আখুন্দজাদা এমন ছিলেন না বলেই দাবি করেছেন অনেক সূত্র। ২০১৬ সালে তাঁকে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয় মূলত ঐকমত্য তৈরির সক্ষমতার কারণে। তাঁর দুই উপ-নেতা ছিলেন সিরাজউদ্দিন হাক্কানি ও মোল্লা ইয়াকুব। বিশ্বস্ত এই দুই উপনেতা যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতেন। কিন্তু ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দ্রুতই এই ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। উপ-নেতারা মন্ত্রিত্বে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন, আর আখুন্দজাদা একক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হন। তিনি কাবুল ছেড়ে কান্দাহারকে ক্ষমতার কেন্দ্র বানান এবং ধীরে ধীরে নিরাপত্তা, ধর্মীয় নীতি ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। এভাবে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধকরণসহ একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত কাবুলের মন্ত্রীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই নেওয়া হয়, যা দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

সিরাজউদ্দিন হাক্কানি ও মোল্লা ইয়াকুবের মতো কাবুলভিত্তিক নেতারা নিজেদের ‘মধ্যপন্থী’ নয়, বরং ‘বাস্তববাদী’ হিসেবে দেখেন। তাঁদের বিশ্বাস, বর্তমান কাঠামোতে আফগানিস্তান দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে পারবে না। তাঁদের কাছে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল সরাসরি অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার ওপর আঘাত। এ কারণেই তাঁরা শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়াই আবারও ইন্টারনেট চালু করার ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে ইন্টারনেট আবারও চালু হলেও দ্বন্দ্বের অবসান হয়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, ধীরে ধীরে কাবুলভিত্তিক নেতাদের সরিয়ে দেওয়া হবে। আবার অন্য সূত্র বলছে, আখুন্দজাদা নিজেই চাপের মুখে পিছু হটেছেন।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ অবশ্য এমন বিভক্তির কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কখনোই বিভক্ত হতে দেব না। মতের পার্থক্য পরিবারে যেমন থাকে, এখানেও তেমনই।’

তবু সাম্প্রতিক বক্তব্য ও ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে—তালেবানের ভেতরের এই মতপার্থক্য শুধু পারিবারিক মতানৈক্য নয়, বরং আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন এক গভীর ক্ষমতার সংঘাত। ২০২৬ সালে এই দ্বন্দ্ব কথার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয় কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed