সৌদি আরব থেকে সুদান: আরব বিশ্বে সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে পাকিস্তান?
![]()
নিউজ ডেস্ক
সৌদি আরব থেকে সুদান তথা মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বে ক্রমেই বাড়ছে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, সুদানের কাছে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র বিক্রির উদ্যোগ এবং একাধিক দেশের সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে আলোচনা— সব মিলিয়ে পাকিস্তান শুধু অস্ত্র রপ্তানিকারক নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠছে কি না সে প্রশ্নই এখন সামনে। তবে আরব বিশ্বের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে এই সম্প্রসারণ পাকিস্তানের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি তৈরি করছে কূটনৈতিক ঝুঁকিও।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, বিশাল অস্ত্রচুক্তির মানদণ্ডে দেখলে সুদানের সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবিত ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তিটি খুব বড় নয়। তবে চলতি জানুয়ারি মাসের শুরুতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, এই চুক্তিটি চূড়ান্তের কাছাকাছি, যা প্রায় তিন বছর ধরে চলা সুদানের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে চলা এই সংঘাতে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ। আরএসএফের বিরুদ্ধে শিশুদেরও ধর্ষণসহ গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।
আর এমন অবস্থায় সুদানের সঙ্গে আলোচনাধীন এই চুক্তিটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের নেয়া একাধিক সামরিক পদক্ষেপেরই অংশ, যা আরব বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রধারী এই দেশটির সামরিক সরঞ্জাম ও প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তান এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশে যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে এবং আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক ভূমিকা মূলত আরব মিত্র দেশগুলোর সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার মধ্যেই সীমিত ছিল।
তবে এই চিত্র এখন বদলাচ্ছে। একের পর এক চুক্তি ও আলোচনা পাকিস্তানকে কোনও কোনও ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সরবরাহকারী দেশে পরিণত করতে পারে, আবার সূক্ষ্ম আঞ্চলিক সংঘাতে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়ার সক্ষমতাও দিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, আরব বিশ্বের ভেতরের বিভাজনের কারণে পাকিস্তানকে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোতে হবে। নইলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি
আরব বিশ্বে পাকিস্তানের সামরিক প্রভাব বাড়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসএমডিএ)। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই চুক্তি সই হয়, ঠিক তার কয়েক সপ্তাহ আগে ইসরায়েল কাতারে হামলা চালালে গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
রয়টার্স জানায়, এরপর সৌদি আরব পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ সৌদি আরবের একটি শক্তিশালী ও আধুনিক বিমানবাহিনী রয়েছে। দেশটির বিমানবাহিনী মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানে সজ্জিত। দেশটি অন্তত ৪৮টি যুক্তরাষ্ট্র-নির্মিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায়ও রয়েছে।
তবে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার কমডোর আদিল সুলতান বলেন, বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সৌদি আরব হয়তো অস্ত্র সরবরাহের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে। তার মতে, পাকিস্তান ঐতিহ্যগত মিত্র এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে সৌদি আরবের জন্য একটি ‘নির্ভরযোগ্য অংশীদার’। জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কিনলে দুই দেশের বিমানবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং এতে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আমির হুসেইনও এ মতের সঙ্গে একমত। তার মতে, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একই ধরনের সামরিক প্ল্যাটফর্ম থাকা যৌক্তিক। লিবিয়া, সোমালিয়া ও সুদানের মতো দেশে স্থিতিশীলতা আনতে কাজ করছে সৌদি আরব, আর তাই সেখানে জেএফ-১৭ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন জেএফ-১৭ আকর্ষণীয়
সৌদি আরব ছাড়াও ইরাক জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর।
জেএফ-১৭ থান্ডার মাল্টিরোল ফাইটার জেট মূলত একটি হালকা, সব আবহাওয়ায় কার্যক্ষম ও হামলা চালাতে সক্ষম যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে এই যুদ্ধবিমান তৈরি করে থাকে। এর ৫৮ শতাংশ উৎপাদন হয় পাকিস্তানে, আর ৪২ শতাংশ চীনে। পাকিস্তান এই যুদ্ধবিমানের এয়ারফ্রেম তৈরি করে, আর চীন সরবরাহ করে অ্যাভিওনিক্স।
জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের সর্বশেষ সংস্করণ ব্লক-৩ কে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে ধরা হয়। এতে রয়েছে আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড হামলার সক্ষমতা, এএসইএ রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং দৃষ্টিসীমার বাইরের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কামরায় অবস্থিত উৎপাদন কেন্দ্রে বছরে ২০ থেকে ২৫টি বিমান তৈরি করা সম্ভব। আজারবাইজান, নাইজেরিয়া ও মিয়ানমার ইতোমধ্যে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের চার দিনের সংঘাতের পর এই বিমানের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে।
সে সময় পাকিস্তান জানিয়েছিল, তারা চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমান দিয়ে ভারতের একাধিক বিমান ভূপাতিত করেছে। ভূপাতিত হওয়া যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের তৈরি রাফাল ফাইটার জেটও ছিল। ওই সংঘাতে পাকিস্তান ৪২টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল, যার মধ্যে জেএফ-১৭ ও এফ-১৬ ফাইটার জেটও ছিল।
২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার দামের এই জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক সস্তা। আর এটিই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় আকর্ষণ।
সূক্ষ্ম ভারসাম্যের রাজনীতি
তবে পাকিস্তানের সামরিক গ্রাহক তালিকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সুদানে পাকিস্তান যাদের অস্ত্র দিচ্ছে সেই সেনাবাহিনী সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট। অন্যদিকে, সুদান অভিযোগ করেছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে সমর্থন দিচ্ছে। যদিও আমিরাত তা অস্বীকার করেছে।
লিবিয়ায়ও পাকিস্তান বিদ্রোহী নেতা খলিফা হাফতারের সঙ্গে বড় চুক্তি করেছে বলে খবর রয়েছে। অথচ সুদানের সেনাবাহিনী হাফতারের বিরুদ্ধে আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ করেছে। এই বাস্তবতায় একই অস্ত্র ভিন্ন পক্ষকে বিক্রি করা পাকিস্তানের জন্য সহজ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন গবেষক উমর করিম।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
অস্ত্র রপ্তানিতে পাকিস্তানের নতুন অধ্যায়
জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ছাড়াও ট্যাংক, ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌ-ব্যবস্থা ও হালকা অস্ত্র রপ্তানি করছে পাকিস্তান। এসআইপিআরআই বলছে, পাকিস্তান এখনও বিশ্বের বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাকিস্তানের অস্ত্র রপ্তানি ১৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে গোলাবারুদ সরবরাহই এর বড় কারণ। পাকিস্তান বর্তমানে আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে রয়েছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি বলেছেন, অস্ত্র রপ্তানি বাড়লে আগামী ছয় মাসের মধ্যে আইএমএফের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।
-আল জাজিরা।