জ্বালানি সংকট ও ‘জোড়-বিজোড়’ নিয়মে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম আকাশচুম্বী, লাভবান জান্তা প্রধানের সন্তানরা
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং জান্তা সরকারের জারি করা পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ওপর জোড়-বিজোড় চলাচল নিষেধাজ্ঞার ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এর দাম হু হু করে বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ছেলে-মেয়ের মালিকানাধীন ইভি আমদানি ব্যবসাগুলো।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য জান্তা সরকারের নতুন বিধিনিষেধে ইভিগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে বাজারে ইভি কেনার হিড়িক পড়েছে, যার বড় সুবিধা পাচ্ছে মিন অং হ্লাইংয়ের ছেলে ও মেয়ের নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলো।
জান্তা সরকার ৩ মার্চ ঘোষণা দেয়, ব্যক্তিগত পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি লাইসেন্স প্লেটের জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী একদিন পরপর চলাচল করতে পারবে। একই নিয়মে জ্বালানি বিক্রিও করা হবে। তবে ইভি এই নিয়মের বাইরে থাকবে। জান্তা সরকার দাবি করেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গাড়ি বিক্রেতারা জানিয়েছেন, জান্তার এই ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই ইভির দাম কয়েক কোটি কিয়াত পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
ইয়াঙ্গুনভিত্তিক এক গাড়ি বিক্রেতা দ্য ইরাবতীকে বলেন, “কয়েক দিনের মধ্যেই ইভির দাম লাফিয়ে বেড়েছে। এখন সবচেয়ে কম দামের মডেলও ১০ কোটি কিয়াতের বেশি। চাহিদা এত বেশি যে ক্রেতারা তাদের পছন্দের মডেল খুঁজে পাচ্ছেন না।”
তিনি আরও বলেন, “আজ যদি আপনি একটি ইভি বিক্রি করেন, কাল একই মডেলের গাড়ি আর কিনে পাওয়া যাবে না।”
তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সতর্ক করে বলছে, ইভির সংখ্যা বাড়লেও এতে দেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান হবে না। কারণ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় এখনও চার্জিং স্টেশন খুবই কম। এছাড়া নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক সময় ইভি চার্জ দেওয়া সম্ভব হয় না।
একজন ডিলার বলেন, “ইভির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে চার্জিং স্টেশনের সংকট বড় সমস্যায় পরিণত হবে।”
মিয়ানমারের ইভি বাজারে মূলত চীনা ব্র্যান্ডের আধিপত্য রয়েছে। জান্তা সরকার ২০২৩ সালে ইভি নীতি চালুর সময় ৯টি কোম্পানিকে ইভি আমদানির অনুমতি দিয়েছিল। পরে এই সংখ্যা বেড়ে ৮০টির বেশি হয়েছে, যদিও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে বর্তমানে প্রায় ৩০টি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে ইভি আমদানি করছে।

জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে বিওয়াইডি (BYD), এমজি৪ (MG4), টয়োটা, হোন্ডা, নিসান, ডংফেং এবং নেটা।
ইভি আমদানিকারকদের জন্য পূর্ণ কর ছাড় রয়েছে এবং ইভি মালিকদের সড়ক টোলও দিতে হয় না। এসব সুবিধার কারণে বাজারে চাহিদা আরও বেড়েছে।
জান্তা নিয়ন্ত্রিত সড়ক পরিবহন প্রশাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১৮ হাজার ৬৩০টি ইভি নিবন্ধিত হয়েছে।
সামরিক শাসনের অধীনে বৈদ্যুতিক গাড়ি এমন বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে যা অন্য কোনো আমদানিকৃত পণ্য পায় না। ব্যাটারি চালিত ইভি এবং এর যন্ত্রাংশের ওপর বাণিজ্যিক কর ও বিশেষ পণ্যের কর মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি, ভোজ্যতেল বা ওষুধের মতো বিদেশি মুদ্রা প্রয়োজন এমন অন্যান্য আমদানির ক্ষেত্রে যেভাবে জান্তা নিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক মুদ্রা তদারকি কমিটির কঠোর নজরদারি থাকে, ইভির ক্ষেত্রে তা নেই।
এর কারণও স্পষ্ট। মিন অং হ্লাইংয়ের দুই সন্তান—ছেলে অং প্যে সোন এবং মেয়ে খিন থিরি থেত মন—দেশের সবচেয়ে বড় কয়েকটি ইভি আমদানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। জান্তা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম যখন ইভিকে আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে প্রচার করছে, তখন এই খাতটি জান্তা প্রধানের পরিবারের অন্যতম লাভজনক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত তারা দুজন মিলে ১ হাজার ২০০টির বেশি ইভি আমদানি করেছেন। এতে তারা মিয়ানমারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম ইভি আমদানিকারকে পরিণত হন।
অং প্যে সোন মূলত বিওয়াইডি ব্র্যান্ডের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি এই চীনা ব্র্যান্ডের একমাত্র আমদানিকারক এবং ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত ৬৭১টি গাড়ি আমদানি করেছেন। এছাড়া এমজি ব্র্যান্ডের গাড়ি আমদানিতেও তার অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই ব্যবসায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সন্তানরা। তাদের মধ্যে আছেন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান ইয়েই উইন উয়ের ছেলে হটেট ইয়াই নাউং, সাবেক কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিন আইয়ের ছেলে ওক্কার আইয়ে, জান্তা সরকারের বিনিয়োগমন্ত্রী ড. কান জাওয়ের ছেলে ইয়েই কান জাও, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল চিট হানের ছেলে কিই থার হান এবং ধনকুবের সেইন উইনের ছেলে গায়ক আহ বয়।
অন্যদিকে তার বোন খিন থিরি থেত মন এনপি.কে. মোটরস নামে একটি কোম্পানি পরিচালনা করেন, যা এমজি ইভি আমদানি করে এবং নেপিদোসহ বড় শহরগুলোতে চার্জিং স্টেশন পরিচালনা করে। ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত তার কোম্পানি ৫৪২টি এমজি গাড়ি আমদানি করেছে। তার প্রধান ব্যবসায়িক অংশীদার নাইং ফিও কিয়াও, যিনি অভিনেত্রী উত মন শুয়ে ইয়ির স্বামী এবং তার অন্যান্য ব্যবসারও শেয়ারধারী।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চার্জিং স্টেশন স্থাপনে এই পরিবারের আগ্রহ শুধু গাড়ি বিক্রির জন্য নয়। চার্জিং স্টেশন স্থাপনের অজুহাতে সহজে জমি অধিগ্রহণ করা যায়। ফলে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট থাকা সত্ত্বেও ইভি খাত সম্প্রসারণে জান্তা প্রধানের সন্তানদের আরও উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর চীনের শেনজেনে বিওয়াইডি সদর দপ্তর সফর করার সময় ইভি খাতে মিন অং হ্লাইংয়ের ব্যক্তিগত আগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর আগে গত বছরের আগস্টে তিনি তিয়ানজিনে চীনা ইভি নির্মাতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মিয়ানমারে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
এদিকে মান্দালয়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জোড়-বিজোড় নিয়ম চালুর পর ইলেকট্রিক বাইকের বিক্রিও বেড়ে গেছে। দাম বেড়েছে এবং দোকানগুলো চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এক দোকান মালিক দ্য ইরাবতীকে বলেন, “গতকাল ৩০টি ই-বাইকের একটি চালান এসেছে এবং সঙ্গে সঙ্গেই সব বিক্রি হয়ে গেছে। এখন আমরা আগাম টাকা নিচ্ছি এবং ক্রেতাদের বলছি যে ডেলিভারি পেতে প্রায় দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।”
বর্তমানে ই-বাইকের দাম ১৬ লাখ ৫০ হাজার কিয়াত থেকে ৮০ লাখ কিয়াতের বেশি পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ কিয়াত দামের মডেলগুলো সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ যখন জ্বালানি সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রতিদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে লড়াই করছে, তখন জান্তা সরকারের নতুন বিধিনিষেধ মিন অং হ্লাইংয়ের সন্তানদের মালিকানাধীন ইভি ব্যবসাকে আরও লাভজনক করে তুলেছে। ২০১১ সালে তিনি সেনাপ্রধান হওয়ার পর থেকেই তাদের ব্যবসা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে, আর এখন দেশের কোটি কোটি মানুষ সংকটের বোঝা বহন করলেও সেই পরিস্থিতি থেকে আরও বেশি লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে এই পরিবারের জন্য।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।