পাহাড়ে অপপ্রচারের নতুন অস্ত্র: গুজব, বিভ্রান্তি ও রাষ্ট্রবিরোধী বয়ান
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ শুধু ভৌগোলিক বা রাজনৈতিকভাবে নয়, তথ্যযুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবেও এক নতুন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। বাস্তবতার চেয়ে বয়ান, ঘটনার চেয়ে ব্যাখ্যা, এই প্রবণতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর এই সুযোগেই কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গুজব, অপতথ্য ও অর্ধসত্যের মিশেলে এমন এক বিভ্রান্তিকর বাস্তবতা তৈরি করছে, যা শুধু সত্যকে আড়ালই করছে না, বরং পুরো অঞ্চলকে নতুন করে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গতকাল রাতে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে, একটি অনিবন্ধিত, নাম-পরিচয়বিহীন ব্লগভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত একটি তথাকথিত প্রতিবেদন দেখলাম, যা এই প্রবণতার নগ্ন উদাহরণ। সেখানে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। যা প্রমাণহীন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সুস্পষ্টভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো ফরেনসিক তথ্য নেই, কোনো স্বাধীন তদন্তের উল্লেখ নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর নির্ভরযোগ্য বক্তব্য নেই, প্রশাসনের কোন বক্তব্য নেই! তবুও ‘বিশেষ সূত্র’ আর একটি অস্পষ্ট ছবিকে ভিত্তি করে গুরুতর অভিযোগ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হল; এটা কি প্রতিবেদন, নাকি পরিকল্পিত অপপ্রচার ছিলো?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে, তা হলো গোয়েন্দা সংস্থার কাজের মৌলিক চরিত্র। একটি সহিংস ঘটনার পর গোয়েন্দা সদস্যদের ঘটনাস্থলে উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়, বরং সেটিই তাদের দায়িত্ব। তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরূপণ; এসবই তাদের নিত্যদিনের কাজের অংশ। অথচ এই স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিকৃত করে ‘অভিযুক্ত উপস্থিতি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, বরং সচেতনভাবে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই অভিযোগ এমন একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে আসছে, যার নিজেরই বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে অপপ্রচারের অভিযোগে যার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে, সেই একই প্ল্যাটফর্ম আবারও গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরছে এবং সেটিকে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। এটি কেবল দায়িত্বহীনতা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত তথ্য-সন্ত্রাসের অংশ বলেই মনে হয়।
গুগল ব্রাউজার ওপেন করে খুব সহজেই আর্কাইভে পেয়ে গেলাম একটি তথ্য। ২০১৯ সালে ওই ব্লগ সাইট থেকে খাগড়াছড়ির তৎকালীন সংসদ সদস্যকে ঘিরে অপপ্রচারের অভিযোগে সেসময় তথ্য প্রযুক্তি আইনের ২৯ ও ৩০ ধারায় সেসময় খাগড়াছড়ি সদর থানায় একটি মামলাও হয়েছিলো সাইটটির বিরুদ্ধে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা সবাই জানে। এখানে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। জাতীয় গণমাধ্যমেও বারবার এসব সংঘর্ষে হতাহতের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যে অঞ্চলে গোষ্ঠীগত সংঘাত একটি বাস্তবতা, সেখানে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডকে কেন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে? এটি কি সত্য অনুসন্ধান, নাকি দায় এড়ানোর কৌশল?
এই ধরনের অপতথ্য শুধু একটি ঘটনার ব্যাখ্যা বিকৃত করে না, এটি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর বয়ান তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্র, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। ইতিহাস বলছে, বিভ্রান্তিকর তথ্যই অনেক সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার বীজ বপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এর প্রভাব আরও গভীর। এটি জাতিগত বিভাজন বাড়ায়, সহাবস্থানের পরিবেশ নষ্ট করে এবং দীর্ঘদিনের শান্তি প্রচেষ্টাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ে সমালোচনার করা যাবে; কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, প্রমাণনির্ভর এবং দায়িত্বশীল। প্রমাণ ছাড়া গুরুতর অভিযোগ তোলা শুধু নৈতিকতার প্রশ্নই তোলে না, বরং আইনি জটিলতাও সৃষ্টি করে। একটি অস্পষ্ট ছবি, অজ্ঞাত সূত্র এবং একপাক্ষিক আবেগনির্ভর বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা; এটি সরাসরি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর শামিল।
আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো: তথ্য আর অপতথ্যের সীমারেখা চিহ্নিত করা। কারণ গুজব এখন আর শুধু মুখে মুখে ছড়ায় না; এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্লেষণ আর অনুসন্ধান- এর মোড়কে হাজির হয়। ফলে সাধারণ পাঠকের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগেই অপপ্রচারকারীরা তাদের উদ্দেশ্য সফল করার চেষ্টা করে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা। যে কোনো তথ্য গ্রহণের আগে তার উৎস, প্রমাণ এবং প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও সময়ের দাবি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখানে শান্তি, উন্নয়ন ও সহাবস্থানের যে কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা নষ্ট করতে সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়, বরং ভেতর থেকে ছড়ানো বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার। সত্যকে আড়াল করে বয়ান তৈরি করার এই প্রবণতা রুখতে না পারলে, ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে পুরো অঞ্চলকেই।
-পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশ্লেষক।