সংবিধান বনাম রাজনীতি—‘আদিবাসী’ শব্দে মির্জা ফখরুলদের দ্বিচারিতা
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শব্দের ব্যবহার কখনোই নিছক ভাষাগত বিষয় নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় দর্শন, সাংবিধানিক অবস্থান এবং নীতিগত দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে (৩১ মার্চ ২০২৬) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থানের এক ধরনের দ্বৈততাও উন্মোচন করেছে।
প্রথমত, বিষয়টি কেবল একটি শব্দ “আদিবাসী” নিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্র কীভাবে তার নাগরিকদের পরিচিতি নির্ধারণ করে, সেই মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ২৩(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি, নৃ-সম্প্রদায় ও সম্প্রদায়” শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে “আদিবাসী” শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই, এটি কেবল একটি অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি সচেতন নীতিগত সিদ্ধান্ত।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাও লক্ষণীয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারিভাবে জারি করা নির্দেশনায়; বিশেষ করে তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে “আদিবাসী” শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের আইনগত ও প্রশাসনিক অবস্থান মিলিয়ে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে শব্দচয়ন কোনো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়।
কিন্তু এই ধারাবাহিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কদিন আগে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুরে এক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং এরও আগে ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে উত্তপ্ত হতে দেখা দিলে সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে দৈনিক ইনকিলাবকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর ‘তারা আদিবাসী হলে আমরা কি? আমরা কি আদিবাসী নই? আমাদের তো বসবাসের কোনো ডেট-তারিখ নেই। যেমন আমেরিকান সাদা চামড়ার মানুষেরা ১৪৯২ সালে তারা আমেরিকা খুজে পেয়েছে। তারা আদিবাসী হলে আমরা কি পরবাসী?’ মন্তব্য—দুইটিই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নির্দেশ করে। সেখানে “আদিবাসী” শব্দের ব্যবহার যেমন আছে, তেমনি তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অর্থাৎ একই রাজনৈতিক ধারার ভেতরেই শব্দটি কখনো গ্রহণযোগ্য, কখনো প্রশ্নবিদ্ধ; এমন এক অসামঞ্জস্য স্পষ্ট।
এই অসামঞ্জস্য সবচেয়ে প্রকটভাবে ফুটে ওঠে মির্জা ফখরুলের গতকালের বক্তব্যে। একদিকে তিনি “ভূমিপুত্র” শব্দ ব্যবহার করে একটি আবেগনির্ভর রাজনৈতিক বার্তা দিতে চান; অন্যদিকে উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আদিবাসী বললে খুশি হন? আচ্ছা আমরা আদিবাসী বলব।” এই বক্তব্য মূলত নীতিগত অবস্থানের নয়, বরং পরিস্থিতিভিত্তিক তুষ্টিকরণের ইঙ্গিত বহন করে।
প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্রের সংবিধান যেখানে একটি নির্দিষ্ট পরিভাষা নির্ধারণ করেছে, সেখানে একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা কি সেই কাঠামোকে উপেক্ষা করে কেবল জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শব্দ নির্বাচন করতে পারেন? যদি করেন, তাহলে তা কি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আরও উদ্বেগজনক হলো, একই বক্তব্যে ভবিষ্যতে “আদিবাসী সমাবেশ” আয়োজনের ঘোষণাও এসেছে। এটি শুধু একটি শব্দের ব্যবহার নয়; বরং একটি বিতর্কিত পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এতে করে দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থান ও প্রশাসনিক নির্দেশনার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানে আরেকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির অন্যান্য নেতাদের বক্তব্যে যেমন দেখা গেছে, জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে “সবাই এক জাতি” এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে—সেখানে আবার আলাদা করে “আদিবাসী” পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব তৈরি করে। একদিকে একক জাতিসত্তার কথা বলা, অন্যদিকে পৃথক পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা; এই দ্বৈততা শেষ পর্যন্ত দলের নীতিগত অবস্থানকেই দুর্বল করে।
বাংলাদেশের সংবিধানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলোকে “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য ও উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, উন্নয়ন কর্মসূচি এবং পার্বত্য অঞ্চলে গৃহীত বিভিন্ন বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠীকে মূলধারার বাইরে ঠেলে না দিয়ে বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা চালানো হয়েছে। ফলে সংবিধানিক স্বীকৃতির এই কাঠামোতে তাদের কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে রাখা হয়েছে—এমনটি একপাক্ষিকভাবে বলা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাষ্ট্র তার সংবিধানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলোকে “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি ও নৃ-সম্প্রদায়” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু “আদিবাসী” (indigenous) পরিচয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেনি। বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ২৩(ক) অনুচ্ছেদে যে পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন; যেখানে নাগরিকদের পরিচয় নির্ধারণে “আদিবাসী” শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিহার করা হয়েছে। ফলে সংবিধানিক ব্যাখ্যার দিক থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে এসব জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; বরং বিকল্প পরিভাষার মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করে। সরকারি নথিপত্রে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী”, “উপজাতি” বা “ethnic communities” শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অন্যদিকে “আদিবাসী” শব্দটি আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যবহৃত হলেও দেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত পরিভাষা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
শুধু সংবিধানই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন থেকে শুরু করে বিশেষ আইন ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তি—কোথাও ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি।
সর্বোপরি, মির্জা ফখরুলের এই অবস্থানকে একটি সুসংহত নীতির বহিঃপ্রকাশ বলা কঠিন। বরং এটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের একটি কৌশল হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হয়। কিন্তু রাষ্ট্র, সংবিধান এবং সংবেদনশীল সামাজিক বাস্তবতার প্রশ্নে এমন কৌশল দীর্ঘমেয়াদে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
রাজনীতিতে সহানুভূতি ও অন্তর্ভুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তা যদি সুস্পষ্ট নীতিগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে, তাহলে সেটি সহজেই পরিণত হয় দ্বিচারিতায়—আর সেই দায় এড়ানোর সুযোগ কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের নেই।