সংবিধান অগ্রাহ্য করে ‘আদিবাসী’ উচ্চারণ তারেক রহমানের: রাজনৈতিক বক্তব্য নাকি রাষ্ট্রীয় বিধির প্রতি অবজ্ঞা?

সংবিধান অগ্রাহ্য করে ‘আদিবাসী’ উচ্চারণ তারেক রহমানের: রাজনৈতিক বক্তব্য নাকি রাষ্ট্রীয় বিধির প্রতি অবজ্ঞা?

সংবিধান অগ্রাহ্য করে ‘আদিবাসী’ উচ্চারণ তারেক রহমানের: রাজনৈতিক বক্তব্য নাকি রাষ্ট্রীয় বিধির প্রতি অবজ্ঞা?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মোঃ সাইফুল ইসলাম

নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে সংবিধান ও সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক শব্দচয়ন নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে গতকাল শনিবার (৮ ফেব্রুয়িারি) দিনাজপুরের বিরামপুরে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় তারেক রহমানের বক্তব্য সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে ভোট চাইতে গিয়ে তিনি বলেন, “যে বাংলাদেশে আমরা মুসলমান হই, আমরা হিন্দু হই, আমরা আদিবাসী হই, আমরা ক্রিস্টান হই, আমরা বৌদ্ধ হই—আমাদের সকলকে বিচার করা হবে আমাদের যোগ্যতা এবং মেধার ভিত্তিতে।”

বক্তব্যটি তাৎক্ষণিকভাবে সাম্যের বার্তা হিসেবে উপস্থাপিত হলেও শব্দচয়ন ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতি, সংবিধান ও প্রশাসনিক নির্দেশনার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

বাংলাদেশের সংবিধান, বিশেষ করে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ২৩(ক) অনুচ্ছেদে, দেশের জনগোষ্ঠীকে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি, নৃ-সম্প্রদায় ও সম্প্রদায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটির কোনো স্বীকৃতি নেই। শুধু সংবিধানই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন থেকে শুরু করে বিশেষ আইন ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তি—কোথাও ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি।

এ বাস্তবতার পরও ‘আদিবাসী’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যবহার নতুন নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে যে স্পষ্ট প্রশাসনিক অবস্থান রয়েছে, তা উপেক্ষা করা সহজ নয়। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল—‘উপজাতি’ বা সংবিধানস্বীকৃত পরিভাষার পরিবর্তে যেন কোথাও ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করা হয়। পরে ২০১৮ সালে তথ্য অধিদপ্তর সাংবাদিকদের উদ্দেশে নির্দেশনা দিয়ে জানায়, “সংবিধান পরিপন্থি ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার বন্ধ করুন।” এর ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি ও গণমাধ্যমে এই শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

এই প্রেক্ষাপটে বিরামপুরের জনসভায় প্রকাশ্যে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নিছক ভাষাগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ খুব সীমিত। একদিকে এটি সংবিধানের বাইরে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আলাদা পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে এমন শব্দ ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোর অভিযোগও উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জাতিসংঘভিত্তিক দাবি এবং দেশের ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদী বয়ানের সঙ্গেও এটি যুক্ত। ফলে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন শব্দ উচ্চারণ রাজনৈতিক বক্তব্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সংবিধানিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে পরিণত হয়।

এক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসছে, নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে ভোটব্যাংক তৈরির বা নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠী টানার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বিশেষ শব্দচয়ন যখন কেবল সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে ভিন্ন ব্যাখ্যা ও দাবি উত্থাপনের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে সামনে আনার চেষ্টা ভবিষ্যতে স্বায়ত্তশাসন, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ বা ভিন্ন রাষ্ট্রীয় বয়ানের প্রশ্নকে উসকে দিতে পারে, যা সরাসরি দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠার আশঙ্কা তৈরি করে।

ভিডিও: দিনাজপুরের বিরামপুরে প্রকাশ্যে নির্বাচনী জনসভায় আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করলেন তারেক রহমান

পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো: সমতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে সংবিধানসম্মত কাঠামোর মধ্যেই। সেই বাস্তবতায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংবিধানস্বীকৃত পরিভাষা উপেক্ষা করে বিতর্কিত শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা রাজনৈতিক সুবিধা আনলেও, তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য জটিল ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের দরজা খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সমালোচকদের আরেকটি বক্তব্য হলো, এ ধরনের শব্দচয়ন অনিচ্ছাকৃত হলেও এর প্রভাব অনিবার্য। যারা দীর্ঘদিন ধরে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের আড়ালে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, আন্তর্জাতিকীকরণ বা বিচ্ছিন্নতামূলক বয়ান ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তারা এমন বক্তব্যকে নিজেদের অবস্থান বৈধ করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে তাই প্রশ্ন উঠছে—ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা অর্জনের তাগিদে কি সংবিধান ও প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষা করা যায়?

উল্লেখ্য, নির্বাচনী রাজনীতিতে সাম্য, সহনশীলতা ও সমঅধিকারের কথা বলা অবশ্যই ইতিবাচক; কিন্তু সেই বার্তা যদি সংবিধানসম্মত ভাষা ও রাষ্ট্রস্বীকৃত পরিভাষা উপেক্ষা করে দেওয়া হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানকেই দুর্বল করে। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য কেবল জনসভায় উপস্থিত শ্রোতাদের জন্য নয়; তা রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে বার্তা দেয়—এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *