পরমাণু কর্মসূচি বৃদ্ধি করেছে চীন, ধরা পড়ল স্যাটেলাইটে

পরমাণু কর্মসূচি বৃদ্ধি করেছে চীন, ধরা পড়ল স্যাটেলাইটে

পরমাণু কর্মসূচি বৃদ্ধি করেছে চীন, ধরা পড়ল স্যাটেলাইটে
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প থেকে সরে আসতে ইরানকে দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরান দাবি করেছে, তাদের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবু গত বছরের জুনে ও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে আক্রমণ চালায় ওই দুই রাষ্ট্র। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন নেতারা চলমান এই সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। মানববিধ্বংসী এই অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের মধ্যে নতুন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন তাদের পারমাণকি প্রকল্পের কাজ আরও সম্প্রসারিত করেছে। এ জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ সিচুয়ানের বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। ২০২২ সালে বাসিন্দাদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে চীন সরকার। সে সময় বাসিন্দারা কেন জমি ‘কেড়ে নেওয়া’ হচ্ছে কারণ জানতে চাইলে কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার কারণে বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সিএনএনের এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে জমি অধিগ্রহণের আসল রহস্য। মূলত পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যাপকভাবে সম্প্রাসারণের গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই জমি কিনেছে চীন সরকার। বাসিন্দাদের উচ্ছেদের তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। একাধিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তাদের গ্রামটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গায় চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র ও কয়েক ডজন চীনা সরকারি নথি পর্যালোচনা করে সিচুয়ান প্রদেশে এই কেন্দ্রগুলোর সম্প্রসারণের বিষয়টি উঠে এসেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল যে, বেইজিং তার পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরালো করেছে। তারা কয়েক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র আধুনিকীকরণ অভিযান পরিচালনা করছে। নির্মাণাধীন ওই স্থানটি ৯০৬ ‍নামে পরিচিত। বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য সিএনএন অন্তত ৫০টি থ্রিডি ছবি সংগ্রহ করেছে।

এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) জানিয়েছে, পুরোনো একটি পারমাণবিক অস্ত্র ঘাঁটির ভেতরে নির্মিত এই স্থাপনাটি তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। এর কাছাকাছি একটি সুড়ঙ্গ পাহাড়ের গায়ে মিশে গেছে।

সাইট ৯০৬। ছবি: সংগৃহীত

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ওই এলাকাটিতে বিশাল স্থাপনা নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি এখনও নির্মাণাধীন। ফলে ধারণা করা যায়, এই স্থাপনাটি এখন পুরোপুরি ব্যবহার শুরু হয়নি। ৩৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের (১৩টি টেনিস কোর্টের সমান) এই শক্তিশালী স্থাপনাটি কংক্রিট ও ইস্পাত দিয়ে ঘেরা। সেখানে তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপক যন্ত্র ও বিস্ফোরণরোধী দরজাও রয়েছে। একটি পাইপ স্থাপনাটি থেকে সর্পিল হয়ে বেরিয়ে উঁচু বায়ুচলাচল চিমনিযুক্ত ভবনে প্রবেশ করেছে।

চীন সরকারের নথি অনুসারে, ৯০৬-এর ভেতরে গম্বুজ আকৃতির স্থাপনাটির নির্মাণ প্রকল্পের নাম ‘এক্সটিজে০০০১’। এই উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো ‘সাইট ৯৩১’। এটি বাইতু গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারিত। বিধায় সেখানকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয় সেসময়। ঘাঁটিটির উন্নয়নের জন্য নিকটবর্তী দশান গ্রাম থেকেও বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল।

একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের মতো অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থকে গম্বুজের ভেতরে আটকে রাখার জন্যই এই ধাঁচে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে। বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

১৯৭১ সালে সর্বপ্রথম গুপ্তচর স্যাটেলাইগুলো জিতং নেটওয়ার্কের ছবি তুলেছিল। তখন মার্কিন গোয়েন্দারা এই স্থাপনাগুলোকে ‘যুগান্তকারী ঘটনা’ হিসেবে গণ্য করেছিল। চীন সরকারের গোপনীয়তা মুক্ত নথি থেকে সিএনএন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, এই পদক্ষেপগুলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাণঘাতী যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদক হওয়ার পথে ধাবিত করবে। চীনের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে যাবে বলে দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণী ২০২২ সালের দিকে এসে বাস্তবে রূপ নেয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মতে, বিশ্বের দ্রুততম পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ চীন। যদিও ৬০০-এর বেশি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বেইজিং এখন ওয়াশিংটন ও মস্কোর অনেক পেছনে পড়ে আছে। চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অস্ত্রের মজুত চারগুণ বেশি।

চীনের বিরুদ্ধে গত ৬ ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ তুলেছিল মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী থমাস ডিনানো। ওই স্থাপনাগুলোর অস্বাভাবিক নকশা ডিনানোর এই দাবিকে কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা দিচ্ছে। তেবে বেইজিং তীব্রভাবে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাদের মূল্যায়নে বেইজিং নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছিল বলে দাবি করেছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন বলেছেন, এসব দাবি ‘তথ্য বিকৃতি করে চীনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা’। সবার জানা, চীন আত্মরক্ষামূলক পারমাণবিক কৌশল অনুসরণ করে এবং ‘প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার’ নীতি মেনে চলে। চীন পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্র।

সিএনএনের অনুসন্ধানী টিমের তিন বিশেষজ্ঞের একজন জেফরি লুইস। মিডলবারি কলেজের বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিষয়ক এই গবেষক বলেন, ‘চীন কী করছে, তা নিয়ে মানুষের সবচেয়ে ভীতিকর আশঙ্কাগুলো যেন এই ভবনটিতে দেখা যাচ্ছে। অনেকটা রোরশ্যাখ টেস্টের (১৯২১ সালে সুইজারল্যান্ডের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হারমান রোরশ্যাখ কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রজেক্টিভ মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা) মতো, অর্থাৎ যে যেমন ভয় দেখে, সে তেমনটাই খুঁজে পায়।’

স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করা অলসোর্স অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষণ ও কার্যক্রম বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনি বাবিয়ার্জ বলেন, এমনও হতে পারে যে, এই স্থানগুলোতে নতুন প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে। নতুন ধরনের জিনিস তৈরি হচ্ছে। এটা স্পষ্ট যে, বাস্তবে অনেক পরিবর্তন ঘটছে।

সিএনএ করপোরেশনের পারমাণবিক ও প্রতিরোধ বিশ্লেষক ডেকার ইভেলেথ এই কার্যকলাপকে পশ্চিমা প্রতিপক্ষদের জন্য হুমকি তৈরি করেতে পারে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, একসময় আমরা চীনারা কতগুলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে সে সম্পর্কে কিছুটা যৌক্তিক অনুমান করতে পারতাম। তবে এই আধুনিকীকরণ যে এত ব্যাপক, তা পুরো ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত প্রযুক্তিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আগামী মে মাসে ঐতিহাসিক সফরে চীন যাচ্ছেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমনের একটি চুক্তি নিয়ে সংলাপ শুরু করার চেষ্টা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিউ স্টার্ট নামে পরিচিত সর্বশেষ অস্ত্র হ্রাস চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

ট্রাম্প মস্কোর সঙ্গে একটি নতুন ও শক্তিশালী চুক্তি করতে চান। সেখানে চীনও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে প্রত্যাশা তার। কিন্তু সিচুয়ান প্রদেশের এই নাটকীয় পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, চীনের সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন হ্রাস পাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।