আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের প্রতিশ্রুতি মিন অং হ্লাইংয়ের, তবুও নিষেধাজ্ঞা বহাল
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের অভ্যুত্থানকারী সেনাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং শুক্রবার শপথ নেওয়ার পর প্রথম ভাষণে আসিয়ান (ASEAN)-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে গত পাঁচ বছর ধরে আঞ্চলিক এই জোটের শীর্ষ বৈঠকগুলোতে তার অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ রয়েছে।
২০২১ সালের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশসমূহের সংগঠন (আসিয়ান) মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে বাদ দেয়। কারণ হিসেবে জানানো হয়, ওই বছরের শুরুতে সহিংসতা বন্ধ, সংলাপ শুরু এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে গৃহীত ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’ বাস্তবায়নে জান্তার ব্যর্থতা। এরপর থেকে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব কেবল “অরাজনৈতিক” ব্যক্তিদের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যা বারবার পুনর্ব্যক্ত করেছে জোটটি।
জান্তা-নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও আসিয়ান এখনো তার প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। এ বিষয়ে জোটের ভেতরে বিভাজন রয়েছে—থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইনস সংলাপের পক্ষে থাকলেও, বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ফিলিপাইনস জোর দিয়ে বলছে, আগে ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস বাস্তবায়ন করতে হবে।
গত জানুয়ারিতে জান্তা ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করলে তা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ওই সময় আসিয়ানের বিশেষ দূত হিসেবে ফিলিপাইনসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া থেরেসা লাজারো নেপিদো সফর করে মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সফরের সময় নিয়ে সমালোচনা উঠলেও তিনি দাবি করেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস।
এ মাসের শুরুতে মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ফিলিপাইনস আবারও ওই চুক্তি “সম্পূর্ণ ও কার্যকরভাবে” বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। দেশটির সরকারি মুখপাত্র ক্লেয়ার কাস্ত্রো সহিংসতা বন্ধ এবং বাধাহীন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পরে লাজারো বিবিসিকে বলেন, প্রেসিডেন্ট হলেও মিন অং হ্লাইং আসিয়ানের শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন না; আঞ্চলিক পর্যায়ে কেবল বেসামরিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাই মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল মিন অং হ্লাইংকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়ে তার নতুন ভূমিকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম আসিয়ান নেতা হন। বার্তায় দুই দেশের “পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন স্বার্থ ও জনগণের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক”-এর কথা উল্লেখ করে মিয়ানমারের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জাতীয় উন্নয়নে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে থাইল্যান্ড মিয়ানমার ইস্যুতে কয়েকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক পর্যায়ে জান্তা নেতৃত্বকে পুনরায় সম্পৃক্ত করা। একই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকক থেকে সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পার্নপ্রি বাহিদ্ধা-নুকারা মিন অং হ্লাইংয়ের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কম্বোডিয়াও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
অন্যদিকে আসিয়ানের সদস্য তিমুর-লেস্তে মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে সার্বজনীন বিচারিক ক্ষমতার আওতায় মামলা শুরু করেছে, যেখানে ২০২১ সালের পর চিন রাজ্যে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়ার প্রসিকিউটররা রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের সময় গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাও গ্রহণ করেছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইং প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন এবং চীনের ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি’র আলোকে এগোনোর কথা বলেন। তিনি “পুনর্মিলন, ন্যায়বিচার, শান্তি ও জাতীয় উন্নয়ন” এগিয়ে নিতে সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনার কথা জানান। তবে লক্ষণীয়ভাবে তার বক্তব্যে ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাসের কোনো উল্লেখ ছিল না।
এদিকে ASEAN Parliamentarians for Human Rights (এপিএইচআর) সতর্ক করে বলেছে, মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট পদকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা সহিংস সামরিক শাসনকে বৈধতা দেবে, যা “বিপুল দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে, সামাজিক বিভাজন গভীর করেছে এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
প্রসঙ্গত, আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ঘোষণার পরও বাস্তবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট ও আঞ্চলিক বিভাজন পরিস্থিতি জটিলই রয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।