দেশে ক্রুডের ডেডস্টকও শেষ, বন্ধ হয়ে গেছে একমাত্র তেল শোধনাগার

দেশে ক্রুডের ডেডস্টকও শেষ, বন্ধ হয়ে গেছে একমাত্র তেল শোধনাগার

দেশে ক্রুডের ডেডস্টকও শেষ, বন্ধ হয়ে গেছে একমাত্র তেল শোধনাগার
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

অপরিশোধিত তেল সংকটের কারণে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল)। রবিবার (১৩ মে) বিকালে শেষ পরিশোধন কার্যক্রম চলেছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির দুই জন কর্মকর্তা।

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতায় প্রায় দুই মাস ধরে ক্রুড তেল আমদানি বন্ধ রয়েছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পরবর্তী আমদানি চালান দেশে আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ইআরএল কর্তৃপক্ষকে। তবে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও প্রভাব পড়বে না বলে আশ্বস্ত করেছে জ্বালানি বিভাগ।

ইআরএল কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম) পাইপলাইনে জমে থাকা পাঁচ হাজার টন এবং অপরিশোধিত তেলের চারটি ট্যাংকের ডেড স্টক (মজুত ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা অপরিশোধিত তেল) তুলেও পরিশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। ইআরএল সাধারণত দৈনিক গড়ে চার হাজার ৫০০ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করে থাকে। তবে ক্রুড সংকটের কারণে গত মাস থেকেই পরিশোধন কমিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টন করা হয়েছিল। গত ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুত দুই হাজার টনের নিচে নেমে এসেছে।

বন্ধের বিষয়টি জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শরীফ হাসনাতের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

নাম না প্রকাশের শর্তে ইআরএলের কর্মকর্তা বলেন, পাঁচটি ট্যাংকের তলানিতে প্রায় ৩৩ হাজার টন ক্রুড তেল ডেড স্টক ছিল। আর এসপিএম থেকে পাঁচ হাজার টন আনা হয়েছিল রিফাইনারিতে। এগুলো দিয়ে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু এটি অনিরাপদ অপারেশন। কারণ ডেডস্টকে ময়লা-বর্জ্য জমে থাকে। এগুলো যেকোনও সময় পাম্পে আটকে যেতে পারে। যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।

ইআরএলের আরেক কর্মকর্তা জানান, রবিবার বিকালে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ট্যাংকের তলানির ১.৫ মিটারের মতো ডেডস্টক ধরা হয়। রবিবার বিকালে তা এক মিটারের নিচে নেমে গেছে। ফলে আর তা ব্যবহার উপযোগী নয়। আর ডেডস্টকের তেলে থাকা বর্জ্য, স্লাগের কারণে প্ল্যান্টের ক্ষতি হতে পারে। এসব বিবেচনায় পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

বিপিসির তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইআরএলে পরিশোধন করা হয়। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেল জাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইআরএল। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ।

দেশে সর্বশেষ ক্রুড তেলের চালান এসেছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর যুদ্ধের ফলে অস্থিরতা শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এশিয়ায় তেল আমদানির প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই একটি জাহাজ গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পথে যাত্রা করার কথা থাকলেও তা আটকে যায়। জাহাজটির চুক্তি বাতিল করা হয়। এছাড়া আবুধাবি থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলের আরেকটি চালানও বাতিল করা হয়েছে।

ফলে ৫৪ দিনে দেশে কোনও ক্রুড তেলের চালান আসেনি। ফলে ক্রুড সংকটে পড়েছে ইআরএল।

বিপিসির কর্মকর্তারা বলেন, সৌদি আরামকোর কাছে থেকে এক লাখ টন ক্রুড তেলের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এই আমদানি চালানের বিপরীতে ইতিমধ্যে ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে বিপিসি। আগামী ২১ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে চালানটি জাহাজীকরণের কথা রয়েছে। চালানটি পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভর না করেই সরাসরি আরব সাগর হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মূলত সৌদি আরব থেকে আমদারি করা অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা মারবান ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করা যায়। এর বাইরে অন্য ক্রুড পরিশোধন করা যায় না। তবে ক্রুড তেল সংকটের অস্থিরতার মধ্যে সরকার মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস থেকে এক লাখ টন ক্রুড কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই চালানের সার্বিক ব্যয় এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।

কর্মকর্তারা বলছেন, ইন্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ হলেও বর্তমানে দেশে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশি দামে কিনেও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের জোগান নিশ্চিত করেছে সরকার

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিপিসির তথ্য বলছে, মার্চে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৭টি জাহাজ আসে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে মোট দুই লাখ ৩১ হাজার ২২৯ টন ডিজেল নিয়ে আসে ৮টি জাহাজ। অন্যান্য চালানে হাই সালফার ফুয়েল অয়েল (ফার্নেস তেল), বেস অয়েল, কনডেনসেট ও অন্য পেট্রোলিয়াম পণ্য ছিল। এ ছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে চারটি চালানে ২২ হাজার টন ডিজেল এসেছে ভারত থেকে।

এ ছাড়া এপ্রিলেও দুটি ডিজেলের, একটি অকটেনের ও একটি ফার্নেস তেলের জাহাজ দেশে পৌঁছেছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *