পাহাড়ে মানবাধিকারের নামে তথ্যযুদ্ধের নীলনকশা
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে এক গভীর ও ভয়ংকর ‘তথ্যযুদ্ধ’ বা প্রক্সি ইনফরমেশন ওয়ার শুরু হয়েছে। এ যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে রয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও শান্তি বাহিনীপ্রধান সন্তু লারমার নাতনি অগাস্টিনা চাকমা। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, অপাহাড়ি বাংলাদেশি নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে জঘন্য মিথ্যাচার করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যকার সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং অপহরণের ঘটনাগুলোকে সুকৌশলে আড়াল করে সাধারণ পাহাড়ি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দোষ চাপানোর এক ‘ভয়ংকর ছক’ বা নীলনকশা আঁকা হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এ অপপ্রচার এবং আন্তর্জাতিক লবিং বহুগুণ বেড়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদক পাচার কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে আড়াল করে অপাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে একপেশে ও বিকৃত বয়ান তুলে ধরা হচ্ছে। দেশ-বিদেশে সভা-সেমিনার, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে সন্তু লারমার নাতনি অগাস্টিনার মূল সহযোগী ইয়েন ইয়েন ও তার স্বামী চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়।
নীলনকশার অংশ হিসেবে সর্বশেষ জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২০ এপ্রিল শুরু হওয়া বৈঠকে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার চলছে এ অগাস্টিনার নেতৃত্বে। এর আগে সুইডেনভিত্তিক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে একপেশে ও অসত্য তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন করানো হয়। মূল লক্ষ্য হলো, পাহাড়কে ‘পূর্ব তিমুর’ বা ‘দক্ষিণ সুদান’-এর মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এসব অপপ্রচার ও আন্তর্জাতিক লবিংয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে। তাছাড়া দেশের স্বার্থে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে অখণ্ডতায় বিশ্বাসী বাংলাদেশি গণমাধ্যমগুলোকে পরিকল্পিত এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক কাঠামোর আলোকে এবং বাস্তবসম্মত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার পরামর্শও দেওয়া হয়।
জাতিসংঘে সার্বভৌমত্ববিরোধী বক্তব্য
নীলনকশার অংশ হিসেবে সর্বশেষ গত ২০ এপ্রিল জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআআই) ২৫তম অধিবেশনে এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস প্যাক্টের (এআইপিপি) সাইড ইভেন্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একপক্ষীয় ও বিভ্রান্তিকর তথ্য
তুলে ধরে বাংলাদেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্য এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো শুরু হয়েছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এ ইভেন্টে সন্তু লারমার নাতনি অগাস্টিনা চাকমাসহ পিসিজেএসএসের তিন প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। বাকি দুজন হলেন—ছনছনা চাকমা ও প্রীতি বিন্দু চাকমা। অধিবেশনে অংশ নেওয়া এ চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন—পল্লব চাকমা, জেনিফার টাউলি কর্পুজ, বিনোতা ময় ধামাই, অর্ণব দেওয়ান ও শোহেল। অধিবেশন চলবে ১ মে পর্যন্ত।
অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে অগাস্টিনা চাকমা দাবি করেন, ২০২৫ সালে জুম্ম নারী ও শিশুদের ওপর ২৬টি গুরুতর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে খাগড়াছড়িতে ১২ বছরের কিশোরী ও ২০২৫ সালের ৫ মে এক কায়াং গৃহবধূ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন, কিন্তু বিচার হয়নি। তিনি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের তদন্ত ক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা, মানবাধিকার কর্মীদের সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তার দাবি জানান।
জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে বলা হয়, জুম্ম ও বাঙালির অনুপাত ৪৮:৫২ এবং কয়েক লাখ বাঙালি সেটলার বসতি স্থাপন করেছে। পিসিজেএসএসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার ১৯৩টির জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। তিনি সেটলার ও রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের মাধ্যমে জুম্মদের সংখ্যালঘু করার অভিযোগও তোলেন।
ছনছনা চাকমা জলবায়ু, ভূমি অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ তুলে সীমান্ত সড়ক, পাথর উত্তোলন, পর্যটন ও বন ধ্বংসের অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালে রাঙামাটির জুরাছড়ি ও বিলাইছড়িতে ২৩টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ এবং ১৭টি পরিবারকে জুমচাষে বাধা দেওয়া হয়েছে। অধিবেশনের প্রথম দিন ২০ এপ্রিল কথিত ‘সামরিকীকরণ বন্ধ’, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ ও এফপিআইসি বাস্তবায়নের দাবি তোলা হয়, যা নিরাপত্তা সূত্র মতে, সংবিধানের ৬(২), ২৩ক, ৮৩ ও ১৪৫ক অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইউএনডিআরআইপির ৩ অনুচ্ছেদ আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বললেও ৪৬(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা উসকে দিতেই এ ধরনের একপক্ষীয় প্রচার চালানো হচ্ছে। ছনছনা চাকমা বাংলাদেশ ইন্ডিজেনাস উইমেন্স নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব; তার বাড়ি রাঙামাটির বরকলে হলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন এবং সন্তু লারমার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বিনোতা ময় ধামাই আদিবাসী অধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রক্রিয়ার (ইএমআরআইপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও এশিয়া সোসিওকালচারাল রিজিয়নের সদস্য; তার বাড়ি খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার বাইল্যাছড়ি গ্রামে।
মানবাধিকারের আড়ালে তথ্যযুদ্ধের নীলনকশা
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘মানবাধিকার’ শব্দের আড়ালে বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ধারাবাহিক অপপ্রচার চলছে। এটি মূলত একটি ‘প্রক্সি তথ্যযুদ্ধ’, যেখানে মানবাধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অখণ্ডতাকে বিশ্বদরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় দুটি সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ-প্রসীত) নীলনকশা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৎপর দেখা যায়।
জানা গেছে, পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) প্রকাশ্য সশস্ত্র শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ প্রধান সন্তু লারমার নাতনি অগাস্টিনা চাকমা, যিনি জন্মসূত্রে একজন কানাডিয়ান নাগরিক এবং কোনোদিন বাংলাদেশে আসেননি। তিনি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী সম্পর্কে ভিত্তিহীন তথ্য এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সন্তু লারমাকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ কিংবা দায় রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, সন্তু লারমা ২৮ বছর ধরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে পার্বত্য অঞ্চলের অগ্রগতিতে কী ভূমিকা রেখেছেন? তার এ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতা গোষ্ঠীর বয়ানে বলা হয়, ইউপিডিএফ (প্রসিত) ২০২৫ সালে তাদের বিরুদ্ধপক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) তিনজন সদস্যকে হত্যা, ৩০ জনকে অপহরণ এবং ২৭ জনকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। তারা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিটি অভিযানকে ‘নির্যাতন’ বা ‘অত্যাচার’ হিসেবে অপপ্রচার চালায়।
পিসিজেএসএসের সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে স্বয়ং ইউপিডিএফ (প্রসীত) বলে থাকে; জেএসএস (সন্তু) আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সশস্ত্র দল পরিচালনা করে। চাঁদাবাজি, খুনখারাবি, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংগঠন দুটি পারস্পরিক সংঘাতে লিপ্ত থাকলেও এরা উভয়ই দেশের সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করে পাহাড় থেকে প্রত্যাহারের লক্ষ্যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে একে অপরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদত বা সহযোগিতা করে আসছে বলে তথ্য পাওয়া যায় ।
পিসিজেএসএসের যাত্রা শুরু ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে; ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি ‘শান্তি বাহিনী’ নামে সশস্ত্র শাখা গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক সহিংসতার অভিযোগ ওঠে ১৯৮৪ সালের ভূষণছড়া ঘটনায় কমপক্ষে ৪০০ বাঙালি বেসামরিক হত্যা, ১৯৮১ সালে একটি বিডিআর ক্যাম্পে হামলায় ১৩ জন নিরাপত্তা সদস্য ও ২৪ জন বেসামরিক নিহত এবং ১৯৯৬ সালে ৩০ জন বাঙালি কাঠুরিয়াকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর খাগড়াছড়ির খেদারাছড়ায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিহত হন। পরে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পিসিজেএসএসের (সন্তু লারমা) মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে সশস্ত্র কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়; তবে সন্তু লারমার নেতৃত্বে ‘জনসংহতি সমিতি (সন্তু)’ সক্রিয় থাকে। শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ১৯৯৮ সালে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ গঠিত হয়; পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বে জেএসএস (সংস্কার), ২০১৭ সালে তপন জ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং ২০২২ সালে নাথান বমের নেতৃত্বে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করে।
অসাংবিধানিক ‘আদিবাসী’ অপতৎপরতা : দেশি–বিদেশি লবিং
বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার যে কৌশলগত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, তার নেটওয়ার্ক গোষ্ঠী বাংলাদেশেও ‘নিরপেক্ষ’ মঞ্চের আড়ালে বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবি প্রচার করে থাকে। চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এবং দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী অধিকারে অগ্রগতি’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকে বিদেশিরা অংশ নেন। এ ধরনের একটি বৈঠকে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতি গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ বৈঠকে দাবি উঠানো হয়, পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে সংবিধানে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া; আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা সীমিত করা। সেই বৈঠকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পরদিন ২৭ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন কমিটি’র সংবাদ সম্মেলনে আবার একই দাবিগুলো উচ্চারিত হয়। এই সময়সংগতি আকস্মিক নয়, এটি একটি সমন্বিত কর্মসূচির অংশ।
এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর ঢাকায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খাইরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা শুরু করে… নিরাপত্তা বাহিনী ও বাঙালিরা পাহাড়ে প্রতিদিন নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে তিনি কীভাবে নিজ দেশের সেনাবাহিনী ও সাধারণ বাঙালিদের ‘ধর্ষক’ ও ‘লুটপাটকারী’ আখ্যা দিলেন? এই ডাহা মিথ্যাচারের উদ্দেশ্য পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর প্রচেষ্টা কি না—সে প্রশ্ন উঠছে।
‘জাতিসংঘ মিশন’ পাঠানোর দাবি
একই অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক এবং অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন দরকার… সংবিধানে আদিবাসী শব্দ সংযুক্ত করতে পারলে খুশি হতাম। নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রশ্ন ওঠে—স্বাধীন বাংলাদেশে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চাওয়ার মানে কী? এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হক বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির সম্পূর্ণ অধিকার উপজাতিদের দিতে হবে।’ পাহাড় থেকে কয়েক লাখ বাঙালিকে উচ্ছেদ করার দাবি তুললেন তিনি। এটা মানিবাধিকারের আড়ালে জাতিগত বিদ্বেষ কি না—প্রশ্ন উঠছে?
অপরাধের ভয়ংকর পরিসংখ্যান : ১২০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি
২০২৫ সালে পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ি সংগঠন ইউপিডিএফ (প্রসীত), জেএসএস (সন্তু), কেএনএফ ও এমএলপির সহিংসতায় অন্তত ৫২ জন নিহত ও ১২৪ জন অপহৃত হন। একই সময়ে ১৮৩টি চাঁদাবাজির ঘটনায় আনুমানিক এক হাজার কোটি থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়। ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ির গিরিফুল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে এক সপ্তাহ পর মুক্তিপণ আদায়, রবি অপারেটরের তিন কর্মীকে সাত মাস আটকে রেখে ছয় কোটি টাকা আদায়, একাধিক গ্রামে হত্যা-নির্যাতন ও ২৭টি গ্রামে অবরোধের ঘটনাও ঘটে। আধিপত্য বিস্তারে ২০২৫ সালেই জেএসএস (সন্তু) ও ইউপিডিএফের (প্রসীত) মধ্যে ৯৬টি সংঘর্ষে প্রায় ১৬ হাজার রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। ১৭ এপ্রিল রাঙামাটির কুতুকছড়িতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সহসভাপতি ধর্মশিং চাকমা (৪২) জেএসএসের (সন্তু) হামলায় নিহত হন। ইউপিডিএফের (প্রসীত) বিরুদ্ধে ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জোর করে কর্মসূচিতে আনা এবং ২১টি র্যালিতে নারী-শিশুকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়িতে বিজিবি এক হাজার ৪০০ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করে, যা জেএসএস (মূল) দলের বলে ধারণা; পরে প্রায় ৫০ জনের সশস্ত্র দল তা উদ্ধারে এলে যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে সরে যায়।
খাগড়াছড়ির সেপ্টেম্বর ২০২৫–এর ঘটনা : মিথ্যা বর্ণনার কেস স্টাডি
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খাগড়াছড়ির ঘটনায় পিসিজেএসএস ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) বিকৃতভাবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে। প্রকৃত তথ্য হলো, খাগড়াছড়ি পৌরসভার সিঙ্গিনালায় একজন মারমা কিশোরীকে নিয়ে কথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে দ্রুত প্রধান অভিযুক্ত চয়ন শীলকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা প্রতিবেদনে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি এবং বিষয়টি বিচারাধীন। কিন্তু পিসিজেএসএস ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) তাদের নিজস্ব মূল্যায়নে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই এটিকে ‘নিশ্চিত ধর্ষণ’ হিসেবে উপস্থাপন করে অনলাইন, স্যোশাল মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু করে। ইউপিডিএফ (প্রসীত) সমর্থিত বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক উক্যনু মারমা অনলাইনে এ বিষয়ে ব্যাপক অপপ্রচার চালাতে থাকে। পাশাপাশি চাকমা সার্কেল চিফ দেবাশীষ রায়ের স্ত্রী ইয়ান ইয়ানসহ ইউপিডিএফের (প্রসীত) বিপুল সদস্য ফেসবুকে উসকানিমূলক এবং আক্রমণাত্মক পোস্ট দিতে থাকেন। তাদের উসকানিতে ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ি সদরস্থ শাপলা চত্বর এলাকায় পাহাড়িরা সমাবেশ করার পাশাপাশি একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর বাজারসহ আশপাশের এলাকায় পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। ইউপিডিএফ (প্রসীত) নিয়ন্ত্রিত সিএইচটি নিউজ, ইন্ডিজিনিয়াস ভয়েজ সিএইচটি এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্রমাগত উসকানিমূলক প্রচার চালাতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও সহযোগী সংগঠনগুলো খাগড়াছড়ি সদর, রামগড়, গুইমারা ও পানছড়ি এলাকায় সহিংস বিক্ষোভ, অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি পালন করে। ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও সহযোগী সংগঠনসমূহ বিজিবি সদস্য ও সামরিক যানবাহনের ওপর হামলা, রামসু বাজার এলাকায় দোকানপাট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করে। সেনাবাহিনী এ সংঘর্ষ থামাতে চেষ্টা করলে ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে প্রথমে দেশীয় অস্ত্র দ্বারা আক্রমণ করে ও পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে গুলি করতে থাকে। ইউপিডিএফ (প্রসীত) সদস্যদের এ হামলা ও গুলিতেই রামসু বাজার এলাকায় তিনজন মারমা ব্যক্তি নিহত এবং অন্তত অর্ধশতাধিক সাধারণ উপজাতি ও বাঙালি আহত হয়।
পিসিজেএসএস বয়ান ; ধর্মান্তকরণের ভুয়া অভিযোগ
পিসিজেএসএসের বয়ানে বলা হয়, ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনে ৬০৬ জন ভুক্তভোগী হয়েছেন; তবে অধিকাংশ তথ্য সংগঠনের নিজস্ব উৎসনির্ভর, যেখানে স্বাধীন সাক্ষ্য, ডাক্তারি প্রমাণ, পুলিশ রিপোর্ট বা আদালতের নথি অনুপস্থিত। প্রতিবেদনে ইউপিডিএফ (প্রসিত)-এর হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা স্বীকার করা হলেও সামগ্রিক দায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপানো হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ৩০ জন ম্রো শিশুকে মাদরাসায় ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার দাবি করা হলেও এর পক্ষে কোনো স্বাধীন যাচাই, পরিবারের তথ্য বা তৃতীয়পক্ষের প্রমাণ নেই। অন্যদিকে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নিজেই ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে, যা ‘দ্য প্রাইস অব বিয়িং বম ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনে এড়িয়ে গিয়ে বম সম্প্রদায়ের দুর্দশার দায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর চাপানো হয়েছে।
নিরাপত্তা সূত্রমতে, কেএনএফ ২০২২ সাল থেকে বান্দরবানের বাঘাইছড়ি, রুমা ও থানচিতে সক্রিয়; বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং তরুণদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত করছে এবং মণিপুর-মিজোরাম সংঘর্ষ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করছে। মিজোরামের কুকি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহায়তার চেষ্টার পাশাপাশি ২০২৪ সালের এপ্রিলে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাও ঘটেছে।
সমাধান হিসেবে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা ও চাঁদাবাজি পরিত্যাগ, সাংবিধানিক কাঠামোয় রাজনৈতিক সংলাপে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে।
-আমার দেশ অনলাইন