শিল্পগ্যালারির প্রতিচ্ছবি খঞ্জনীঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভেতরে ঢুকলে মন চায় না বের হতে
নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী ও রঙিন দেয়ালচিত্রে সাজানো কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খঞ্জনীঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”
![]()
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উপকূলীয় জনপদ ভেওলা মানিকচর ইউনিয়ন। স্থানীয়দের কাছে বি.এম চর ইউনিয়ন নামে পরিচিত। এই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাম খঞ্জনীঘোনা। একসময় এখানে শিক্ষা ছিল অবহেলিত, শিশুরা বইয়ের চেয়ে বেশি পরিচিত ছিল মাছ ধরার জাল, নোনা পানির সংগ্রাম ও দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। সেই এলাকাতে এখন দাঁড়িয়ে আছে এক দৃষ্টিনন্দন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নাম খঞ্জনীঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। বাঁশের বেড়া, ছনের ছাউনি, ঘুণপোকায় ক্ষতবিক্ষত ভাঙাচোরা বেঞ্চ আর অনুপ্রেরণাহীন পরিবেশে কোনোমতে চলতো পাঠদান। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। সময়ের পালাবদলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এসে তা রূপ নিয়েছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক শিক্ষাঙ্গনের। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গ্রামীণ জনপদের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা রঙ ও কারুকাজে সাজানো কোনো শিল্পগ্যালারি। ৪০ শতক জমির ওপর নির্মিত তিনতলা ভবন, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী ও রঙিন দেয়ালচিত্রে সাজানো পুরো ক্যাম্পাস।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ পেরুতেই দেয়ালে চোখে পড়ে। সেখানে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের চেতনা, বীরশ্রেষ্ঠদের প্রতিকৃতি, বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের মুখচ্ছবি, বিজ্ঞানভিত্তিক নানা চিত্র, স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ, গ্রামীণ প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য আর শিশুদের প্রিয় মিনা-রাজুর রঙিন কার্টুন। প্রতিটি দেয়াল যেন শিক্ষার্থীদের শেখায়- শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্যও শিক্ষার অংশ। এছাড়া চারপাশের খোলা-মেলা পরিবেশ, আলো-বাতাস, সবুজের সমারোহ ও সারি সারি কলাগাছ বিদ্যালয়কে আরও আকর্ষণীয় করে তুলে।

শ্রেণিকক্ষের ভেতরে দেখা যায়, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আনন্দঘন পরিবেশে পাঠগ্রহণে ব্যস্ত। কেউ দেয়ালে আঁকা বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি দেখে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানা চেষ্টা করছে, আবার কেউ বিজ্ঞানের নানা বিষয় ও আবিষ্কার সম্পর্কে কৌতূহল প্রকাশ করছে। প্রাণবন্ত এই পরিবেশে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ছিল, চোখে পড়ার মত। এছাড়া বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে শিক্ষকদের মাঝেও ফুটে উঠেছে আত্মতৃপ্তি ও গর্বের অনুভূতি।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়নে এবং কেয়ার বাংলাদেশ বিদ্যালয়টির সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন করে। যদিও প্রকল্প, কাজের বাজেট বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি শিক্ষকেরা। তবে শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়ক নানা সৃজনশীল উপাদানে পুরো ক্যাম্পাস সাজানো হয়েছে।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১২১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। পাঠদানের জন্য কর্মরত আছেন তিনজন নারী ও দুইজন পুরুষ শিক্ষক। তাদের আন্তরিকতা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে বদলে যাচ্ছে পিছিয়ে পড়া এই উপকূলীয় এলাকার শিক্ষার চিত্র।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, “এমন একটি দৃষ্টিনন্দন ও শিশুবান্ধব বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পেরে সত্যিই গর্ব অনুভব করি। আগে এই এলাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে মাছ আহরণ বা জীবিকার কাজে যুক্ত করতেন। আমরা এখন এলাকায় এলাকায় গিয়ে অভিভাবকদের বুঝাই- শিক্ষাই পারে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে। অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যালয়ের পরিচর্যা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান এবং বিদ্যালয়মুখী পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছি। যখন দেখি শিশুরা আনন্দ নিয়ে স্কুলে আসে, দেয়ালের ছবি দেখে নতুন কিছু জানতে চায়, তখন সব পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।”
সহকারী শিক্ষক মো. ফখর উদ্দিন বলেন, “বিদ্যালয়টি এখন শুধু একটি স্কুল নয়, পুরো এলাকার গর্ব। এত সুন্দর পরিবেশে শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ নিয়ে ক্লাস করে। অভিভাবকরাও বিদ্যালয়ে এসে মুগ্ধ হন।”
সহকারী শিক্ষক সায়মা সুলতানা বলেন, “এমন সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও প্রাণবন্ত পরিবেশে পাঠদান করতে নিজের কাছেও অনেক ভালো লাগে। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে এলে মনটা প্রশান্ত হয়ে যায়। শিশুদের হাসিমুখ, দেয়ালের রঙিন চিত্র আর খোলা পরিবেশ তাদের শেখার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। একটি সুন্দর বিদ্যালয় শিশুর মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এটা এখানে খুব কাছ থেকে অনুভব করছি।”

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নুরাইন জান্নাত রাউনাফ বলে, “এত সুন্দর স্কুলে প্রতিদিন আসতে আমার খুব ভালো লাগে। সকালে স্কুলে এসে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করি, আবার অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা ও হাঁটাচলা করি। আমাদের স্কুলের দেয়ালে বিজ্ঞান বিষয়ের নানা ধরনের ছবি আঁকা রয়েছে। সেগুলো দেখে স্যারদের জিজ্ঞেস ক,রি এগুলো কী কাজে লাগে। তখন স্যাররা খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন। স্কুলে এসে প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় শিখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।”
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোটন মিয়া বলে, “আমাদের স্কুলটা খুব সুন্দর। দেয়ালে গ্রামের দৃশ্য, মুক্তিযুদ্ধের ছবি আর মিনা-রাজুর ছবি দেখতে ভালো লাগে। স্কুলে এলে মন ভালো হয়ে যায়।”
বিদ্যালয়ের জমিদাতা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিদ্দিক আহমদ বলেন, “একসময় এই বিদ্যালয়ের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। বাঁশের বেড়া, ছনের ছাউনি ছিল। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়টিকে এই অবস্থায় এনেছি। আগে শিক্ষার্থী অনেক কম ছিল। এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগা করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “স্বপ্ন দেখতাম আমাদের পিছিয়ে পড়া এলাকাতেও একদিন সুন্দর একটি বিদ্যালয় হবে। সেই চিন্তা থেকেই জমি দিয়েছি, এলাকাবাসীকে সচেতন করেছি, বিদ্যালয়ের উন্নয়নে শ্রম দিয়েছি। আজ যখন দেখি শিশুরা আনন্দ নিয়ে পড়ালেখা করছে, তখন মনে হয় আমাদের কষ্ট সার্থক হয়েছে। আমরা চাই, এই বিদ্যালয় পুরো এলাকার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক।”
বিএমচর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য এম বশির আহমদ বলেন, বিদ্যালয়টি আজ সবার প্রশংসা কুড়াচ্ছে। শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, এর নান্দনিক সৌন্দর্যও মানুষকে মুগ্ধ করে। তাই দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক মানুষ বিদ্যালয়টির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে আসেন।”
কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিন মিয়া বলেন, “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যতই দৃষ্টিনন্দন ও মনোরম পরিবেশের হোক না কেন, অনেক অভিভাবকের মাঝে এখনও একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, এসব বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা যথাযথভাবে পড়ানো হয় না। এ কারণে তারা সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন। তাই আমরা শিক্ষকদের নির্দেশনা দিচ্ছি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যেন সব ধর্মের ধর্মীয় বই গুরুত্বসহকারে ও সঠিকভাবে পাঠদান করা হয়।”
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।