জেএসএস ও ইউপিডিএফের ত্রিমুখী চাপ: কীভাবে পদত্যাগে বাধ্য হলেন সজ্জন রাজনীতিজ্ঞ দীপেন দেওয়ান?

জেএসএস ও ইউপিডিএফের ত্রিমুখী চাপ: কীভাবে পদত্যাগে বাধ্য হলেন সজ্জন রাজনীতিজ্ঞ দীপেন দেওয়ান?

জেএসএস ও শান্তি-সম্প্রীতির আহ্বান দীপেন দেওয়ানের, পদত্যাগ ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে ফেসবুক স্ট্যাটাসইউপিডিএফের ত্রিমুখী চাপ: কীভাবে পদত্যাগে বাধ্য হলেন সজ্জন রাজনীতিজ্ঞ দীপেন দেওয়ান?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এক ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে রাঙামাটির ২৯৯ নম্বর আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য এবং পরবর্তীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার মাত্র তিন মাসের মাথায়, গত ১ জুন আকস্মিক ‘স্বাস্থ্যগত কারণ’ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি, যা তাৎক্ষণিকভাবে গৃহীতও হয়।

তবে সচেতন মহল এবং স্থানীয় রাজনীতির অন্দরে কান পাতলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই পদত্যাগ কেবলই স্বাস্থ্যগত কারণে নয়। বরং আঞ্চলিক সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর আকাশচুম্বী অনৈতিক দাবি, পাহাড়ের জটিল সমীকরণ এবং দলীয় কোন্দলের ত্রিমুখী চাপের মুখেই অত্যন্ত সজ্জন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এই মানুষটি মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত নির্বাচনে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সরাসরি কোনো প্রার্থী দেয়নি। পর্দার আড়াল থেকে তারা দীপেন দেওয়ানকে সমর্থন দিয়েছিল। তবে এই সমর্থনের পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী ও বিতর্কিত এক রাজনৈতিক স্বার্থ।

জেএসএস-এর মূল লক্ষ্য ছিল, দীপেন দেওয়ান মন্ত্রী হলে পার্বত্য চুক্তির এমন কিছু ধারা (যা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য বাস্তবায়নে চরম চ্যালেঞ্জিং) বাস্তবায়নে তাকে বাধ্য করা। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদগুলোর পুনর্গঠনে জেএসএস-পন্থী বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসানোর জন্য তারা মন্ত্রীর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাঙামাটিতে জেএসএস সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি উষাতন তালুকদারের বক্তব্যেও এমন অনৈতিক দাবি ও হুমকির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছিল। জেএসএস নেতারা প্রকাশ্যে এমনও বলতে শুরু করেছিলেন, “আমরা ভোট দিয়ে জিতিয়েছি, সুতরাং আমাদের সব কথা শুনতে হবে।”

এদিকে জেএসএস-এর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ (চুক্তি বিরোধী অংশ) শুরু থেকেই দীপেন দেওয়ানকে ‘জেএসএস সমর্থক’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তাদের কৌশল ছিল ভিন্ন। একদিকে তারা চায়নি জেএসএস সরকারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা পাক, অন্যদিকে নিজেদের আখের গোছাতে তারাও মরিয়া ছিল।

ইউপিডিএফ নেতারাও জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগ দেওয়ার জন্য মন্ত্রীর ওপর সমান্তরাল চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। বিভিন্ন প্রকল্প পছন্দের জন্য তদবির ছিল। একপ্রকার জেএসএস-কে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে এবং দীপেন দেওয়ানকে বিতর্কিত করতেই তারা জলঘোলা করতে শুরু করে।

দলীয় কোন্দল ও একজন সজ্জন মানুষের অসহায়ত্ব

২০০৫ সালে যুগ্ম জজের মর্যাদাপূর্ণ চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন দীপেন দেওয়ান। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ, তা পাহাড়ি হোক বা বাঙালি সকলের কাছেই তিনি একজন শান্ত, ভদ্র ও উদারপন্থী মানুষ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ প্রথম থেকেই তাঁর এই সর্বজনীন নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেনি, ফলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল লেগেই ছিল।

দলীয় কোন্দল সামাল দেওয়া হয়তো সম্ভব ছিল, কিন্তু আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর স্বার্থান্বেষী হিংস্র রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হতে রাজি ছিলেন না দীপেন দেওয়ান। স্থানীয় বেশ কয়েকজন পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা যায়:
“দীপেন দেওয়ান ছিলেন পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের মন্ত্রী। তিনি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেট বা সই-স্বাক্ষর করার মেশিন হতে চাননি। জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর আকাশচুম্বী ও অসাংবিধানিক চাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি যদি আঞ্চলিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থে কাজ করতেন, তবে তিনি জনগণের কাছে বিতর্কিত হতেন। আর এই পরিচ্ছন্ন মানুষটিকে বিতর্কিত করতেই চাপ প্রয়োগ করে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।”

দীপেন দেওয়ানের মূল স্বপ্ন ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং পিছিয়ে পড়া এই জনপদের সার্বিক উন্নয়ন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যেও এই স্বপ্নের প্রতিফলন দেখা গেছে। কিন্তু পাহাড়ের তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলো কখনই চায় না পাহাড়ের মূল ধারার টেকসই উন্নয়ন হোক। কারণ পাহাড় অনগ্রসর ও অশান্ত থাকলেই তাদের চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের রাজনীতি টিকে থাকে। ফলে নিজেদের পথের কাঁটা সরাতেই তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ভালো মানুষটিকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য করেছে।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার ঝড় বইছে। স্থানীয় বিএনপির বড় একটি অংশ তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে তাঁকে পুনরায় স্বপদে ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।

অন্যদিকে, দীপেন দেওয়ানের মতো একজন সজ্জন রাজনীতিকের এই বিদায়ের পর দায় এড়াতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ এখন একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্রের জোর আর আঞ্চলিক দলগুলোর নোংরা স্বার্থের বলী হয়েছেন একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক মন্ত্রী।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *