প্রহার নীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ, সুযোগ ও করণীয়

প্রহার নীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ, সুযোগ ও করণীয়

প্রহার নীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী ভবিষ্যৎ: বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ, সুযোগ ও করণীয়
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

ড. সরদার আলী হায়দার

ভারতের নতুন PRAHAAR বা প্রহার নীতি দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এত দিন ভারতের সন্ত্রাসবাদবিরোধী ব্যবস্থা অনেকাংশে বড় ধরনের হামলা, সীমান্ত অস্থিরতা, কাশ্মীরকেন্দ্রিক সহিংসতা, মুম্বাই হামলার অভিজ্ঞতা এবং আন্তসীমান্ত জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রহার নীতি সেই প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানকে আরও সুসংগঠিত, গোয়েন্দা-নির্ভর, আন্তঃসংস্থা সমন্বিত এবং সমাজভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আনতে চেয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নথিতে প্রহার নীতিকে সাতটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে। এগুলো হলো প্রতিরোধ, প্রতিক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার সমন্বয়, মানবাধিকার ও আইনের শাসন, উগ্রপন্থার অনুকূল পরিবেশ কমানো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সামঞ্জস্য, এবং পুনরুদ্ধার ও সহনশীলতা। সহজভাবে বললে, এই নীতি শুধু সন্ত্রাসী হামলার পর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে না; বরং হামলার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা, সমাজকে সচেতন করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, অর্থায়নের পথ বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।

এই নীতির গুরুত্ব শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। অধিকাংশ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের স্থল বা সামুদ্রিক সংযোগ রয়েছে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা পরিবেশেও ভারতের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। তাই ভারতের মতো একটি বড় প্রতিবেশী যখন নতুন জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি গ্রহণ করে, তখন তার প্রভাব শুধু ভারতের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

বর্তমান সময়ে সন্ত্রাসবাদ আর শুধু অস্ত্রধারী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ বা জঙ্গি আস্তানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন অনেক বেশি জটিল। অনলাইন উগ্রবাদ, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, সাইবার নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, সন্দেহজনক অর্থায়ন, ক্রিপ্টো লেনদেন, মাদকপাচার, মানবপাচার, অস্ত্র চোরাচালান, সমুদ্রপথ এবং সংঘাতপ্রবণ সীমান্ত এলাকা, সবকিছুই এখন সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হতে পারে। ভারতের প্রহার নথিতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, এনক্রিপশন, ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টো ওয়ালেট, ড্রোন এবং সাইবার আক্রমণকে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের নিরাপত্তা হুমকি কোনো এক দেশের সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। একটি দেশের দুর্বলতা দ্রুত আরেক দেশের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত, মিয়ানমার, বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

প্রহার নীতি দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী ভবিষ্যৎকে কয়েকটি পথে প্রভাবিত করতে পারে। প্রথমত, এটি গোয়েন্দা-নির্ভর নিরাপত্তা সমন্বয়কে আরও গুরুত্ব দিতে পারে। আধুনিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এখন ছোট ছোট সেল, অনলাইন যোগাযোগ, ভুয়া পরিচয়, অপরাধী চক্র এবং সীমান্তপথ ব্যবহার করে কাজ করে। তাই শুধু হামলার পর তদন্ত করাই যথেষ্ট নয়। হামলার আগেই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, সতর্কতা ও প্রতিরোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, সাইবার উগ্রবাদ ও ডিজিটাল অর্থায়নের ওপর নজরদারি বাড়বে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শ ছড়ানো, অনলাইনে নিয়োগ, বিদেশি অর্থায়ন, ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার এবং সন্দেহজনক লেনদেন এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় উদ্বেগ। তৃতীয়ত, সীমান্ত ও সমুদ্র নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। চতুর্থত, সন্ত্রাসবাদ, সংগঠিত অপরাধ, মাদকপাচার, মানবপাচার এবং অর্থপাচারের সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হবে। পঞ্চমত, ভারত আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী ভাষা, ধারণা এবং সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই নীতিকে আবেগ দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ রাখাইন ও চিন অঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সামুদ্রিক পথের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভারতের যেকোনো বড় নিরাপত্তা নীতি বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে এটিকে ভারতবিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন নেই। আবার অন্ধভাবে অনুসরণ করারও প্রয়োজন নেই। বরং বাংলাদেশের উচিত প্রহার নীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতা হিসেবে পড়া। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তা কাঠামো, আইনি সুরক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সাইবার সক্ষমতা, আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য প্রহার নীতির কিছু সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জঙ্গি চলাচল, ভুয়া কাগজপত্র, অস্ত্রপাচার, মাদকপথ, সন্দেহজনক অর্থায়ন, সাইবার উগ্রবাদ এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে। দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়, যৌথ মূল্যায়ন এবং সীমান্ত পর্যায়ের যোগাযোগ আরও নিয়মিত হলে তা উভয় দেশের জন্যই উপকারী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়তে পারে। বঙ্গোপসাগর এখন শুধু বাণিজ্যপথ নয়; এটি জ্বালানি, মৎস্যসম্পদ, বন্দর, সামুদ্রিক যোগাযোগ, জলবায়ু নিরাপত্তা, পাচারবিরোধী অভিযান এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশের নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, কাস্টমস, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সামুদ্রিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো জরুরি। ভারতসহ অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও সমুদ্র নজরদারি বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে।

তৃতীয়ত, আর্থিক গোয়েন্দা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত্রাসে অর্থায়ন এখন আর শুধু নগদ অর্থের মাধ্যমে হয় না। ব্যাংকিং চ্যানেল, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, হুন্ডি, ভুয়া ব্যবসা, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার, ক্রিপ্টো লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ সবই ঝুঁকির অংশ হতে পারে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ইতোমধ্যে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রহার নীতিতে ডিজিটাল অর্থায়ন ও ক্রিপ্টো-ঝুঁকির ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশকেও নিজের আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও উন্নত করতে উৎসাহিত করতে পারে।

তবে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। প্রথম ঝুঁকি হলো, ভারত আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদকে প্রধানত নিজের নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে পারে। ভারতের নিরাপত্তা চিন্তায় পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠী, কাশ্মীর, আন্তসীমান্ত জঙ্গিবাদ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের জন্য এগুলো বাস্তব উদ্বেগ। কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা পুরোপুরি একই নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার রয়েছে। যেমন রোহিঙ্গা সংকট, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতা, সাইবার উগ্রবাদ, মাদকপাচার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং যুবসমাজের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ।

দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো কৌশলগত চাপ। ভারত যদি প্রহার নীতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ভারতের হুমকি-ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ অবশ্যই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, কারণ নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সহযোগিতা হতে হবে প্রমাণভিত্তিক, আইনসম্মত, নথিভুক্ত এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। কোনো অনানুষ্ঠানিক তথ্য বিনিময়, নাগরিক তথ্যের অসতর্ক ব্যবহার, অথবা একতরফা নিরাপত্তা ব্যাখ্যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তৃতীয় ঝুঁকি হলো সীমান্ত অঞ্চলের অতিরিক্ত নিরাপত্তাকরণ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত শুধু নিরাপত্তা রেখা নয়। এটি মানুষের জীবন, কৃষি, বাণিজ্য, আত্মীয়তা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। সীমান্তবাসী মানুষ অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতির সরাসরি প্রভাব অনুভব করে। অতিরিক্ত সন্দেহ, নজরদারি, কড়াকড়ি বা কঠোরতা তাদের মধ্যে ভয়, দূরত্ব এবং ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। তাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি কখনোই শুধু বাহিনী-নির্ভর হওয়া উচিত নয়। এর সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি পুলিশিং, যুবসম্পৃক্ততা এবং উন্নয়নকে যুক্ত করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্র। বাংলাদেশ প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে অধিকাংশ রোহিঙ্গা বসবাস করছে এবং কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরেও স্থানান্তর করা হয়েছে। এত বড় মানবিক সংকট বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং কূটনীতির ওপর গভীর চাপ তৈরি করেছে। এই সংকটকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন আছে। তবে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা অন্যায় এবং কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর।

বাংলাদেশকে একদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধী নেটওয়ার্ক, মাদকপাচার, মানবপাচার, উগ্রবাদী অপব্যবহার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব ঠেকাতে হবে। অন্যদিকে মানবিক মর্যাদা, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নীতিও ধরে রাখতে হবে। নিরাপত্তা ও মানবিকতা, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের করণীয় তাই কয়েকটি স্তরে ভাবতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশকে নিজের সন্ত্রাসবাদবিরোধী কাঠামোর একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করতে হবে। প্রহার নীতিকে সরাসরি অনুকরণ করার দরকার নেই। বরং বাংলাদেশের নিজস্ব ঝুঁকি চিহ্নিত করতে হবে। আমাদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সীমান্তভিত্তিক অপরাধ, অনলাইন উগ্রবাদ, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা, মাদক-সন্ত্রাস সংযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতা এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় বাড়াতে হবে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, সাইবার ইউনিট এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও দায়িত্ব বণ্টন আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার। অনেক সময় একই সমস্যা নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ করে, কিন্তু সমন্বয় দুর্বল থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। তাই একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা পদ্ধতি প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা অবশ্যই সার্বভৌমত্ব-সংবেদনশীল হতে হবে। তথ্য বিনিময় হবে আইনসম্মত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নথিভুক্ত।
নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক তথ্য, অভিবাসন রেকর্ড বা নিরাপত্তা মূল্যায়ন কোনোভাবেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাগ করা উচিত নয়। নিরাপত্তা সহযোগিতা যতই জরুরি হোক, তা আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের বাইরে যেতে পারে না।

চতুর্থত, বাংলাদেশকে সাইবার ও আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে। ডিজিটাল প্রচারণা, অনলাইন নিয়োগ, সন্দেহজনক লেনদেন, ক্রিপ্টো-সম্পর্কিত ঝুঁকি, মানি লন্ডারিং এবং ভুয়া অনলাইন নেটওয়ার্ক শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জরুরি। শুধু নিরাপত্তা বাহিনী নয়, ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সেবা, টেলিযোগাযোগ খাত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সমন্বয় প্রয়োজন।

পঞ্চমত, সীমান্ত অঞ্চলে উন্নয়নকে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সীমান্তে শুধু কাঁটাতার, চেকপোস্ট বা টহল বাড়ালেই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অবকাঠামো, বৈধ বাণিজ্য, স্থানীয় নেতৃত্ব, কমিউনিটি পুলিশিং এবং যুবকদের ইতিবাচক সম্পৃক্ততা সীমান্তভিত্তিক অপরাধ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

ষষ্ঠত, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক নজরদারি, বন্দর নিরাপত্তা, উপকূলীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক তথ্য বিনিময় জোরদার করতে হবে। সমুদ্রপথে মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার, অবৈধ মাছধরা এবং সন্দেহজনক চলাচল এখন বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। বাংলাদেশকে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস এবং উপকূলীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

সপ্তমত, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে। BIMSTEC, SAARC-এর সম্ভাব্য কাঠামো, ASEAN সংলাপ, UNODC এবং জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কোনো একক দেশের বয়ানে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুপাক্ষিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথে এগিয়ে নিতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, প্রহার বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে একটি নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে, কারণ বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় প্রতিবেশী সহযোগিতা অপরিহার্য। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজের আইনি সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত স্বাধীনতা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা, তথ্য নিরাপত্তা এবং স্বাধীন হুমকি মূল্যায়ন ধরে রাখতে হবে।

বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত সহযোগিতা, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে; আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; নিরাপত্তা প্রস্তুতি, কিন্তু আইনের শাসন ও মানবিক মর্যাদা বজায় রেখে। প্রহারকে তাই বিরোধিতা বা অনুকরণের দৃষ্টিতে নয়, বরং বাংলাদেশের নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed