ইউনিফর্মে বা বাইরে—মিন অং হ্লাইংই মিয়ানমারে শান্তির প্রধান অন্তরায়
![]()
ল্যারি জাগান
গত শুক্রবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সাবেক সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। যৌথ অধিবেশনে মোট ৫৮৪ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৪২৯ জনের সমর্থনে তিনি নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার অবৈধ ক্ষমতা দখলের পর প্রতিষ্ঠিত সরাসরি সামরিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটছে, এবং আগামী পাঁচ বছর তিনি দেশ শাসন করবেন।
তবে রাজধানী নেপিডোতে এই আয়োজন চললেও দেশের অধিকাংশ মানুষ এতে আগ্রহী নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইয়াঙ্গুনের এক ট্যাক্সিচালক বলেন, “সংসদে কী হচ্ছে বা কে প্রেসিডেন্ট হচ্ছে—এসব নিয়ে কেউই মাথা ঘামায় না। কিছুই বদলাবে না, সামরিক বাহিনীই ক্ষমতায় থাকবে। এটা নির্বাচন নয়, বরং মনোনয়ন।”
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি কাউকেই ধোঁকা দিতে পারেনি। প্রথমে সংসদের উচ্চকক্ষ, নিম্নকক্ষ এবং সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত ২৫ শতাংশ সদস্যদের পৃথক অংশ থেকে তিনজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। এরপর একটি সংসদীয় কমিটি তাদের যোগ্যতা যাচাই করে, এবং শেষে মিন আউং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়।
গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচন দেশ-বিদেশে অনেকেই ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এটি ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৈধ করার প্রচেষ্টা এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার তার দীর্ঘদিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের অংশ।
গত বছর নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) এক সদস্য বলেন, “মিন অং হ্লাইং অবশ্যই প্রেসিডেন্ট হবেন।” আর অভ্যুত্থানের আগে ইয়াঙ্গুনে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, “শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি ছিল একটি প্রহসন।”
ইয়াঙ্গুনভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক কো মাউং বলেন, “এতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে না। এই সামরিক কর্মকর্তারা হয়তো ইউনিফর্ম ছেড়ে বেসামরিক পোশাক পরবেন, কিন্তু তাদের অগ্রাধিকার, নীতি ও পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তারা ইতোমধ্যে দেশটিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে এবং এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো ধারণাও তাদের নেই।”
তবে মিয়ানমারের ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ আশাবাদী—অন্তত কিছুটা—যে মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন এই আধা-বেসামরিক সরকার হয়তো সবাইকে ভুল প্রমাণ করতে পারে, যেমনটি ২০১০ সালের নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সরকার করেছিল। তখনও নির্বাচনকে প্রহসন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সামরিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত না রেখে থেইন সেইন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নেন এবং সীমিত গণতান্ত্রিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু করেন। তিনি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জাতীয় যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের উদ্যোগও নেন, যা নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুগের সূচনা করেছিল।
একজন মিয়ানমার ব্যবসায়ী, যিনি থেইন সেইন সরকার ও পরবর্তী সময়ে অং সান সু চির সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন, বলেন, “থেইন সেইন ও তার মন্ত্রীরা দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন যে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং বাজার অর্থনীতি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান খুবই সীমিত।”
তিনি আরও বলেন, “থেইন সেইন শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরজা খুলে দেননি, বরং অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও যোগাযোগের পথও উন্মুক্ত করেছিলেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তার নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু মিন আউং হ্লাইং উল্টো সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করছেন, নজরদারি বাড়াচ্ছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্সরশিপ বৃদ্ধি করছেন।”
বিশ্বজুড়ে স্বৈরশাসকদের মধ্যে সেনাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্টে রূপান্তর হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল নতুন নয়; এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করে।
একজন মিয়ানমার শিক্ষাবিদ বলেন, “মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা ভাগাভাগি, গণতান্ত্রিক সংস্কার বা অর্থনৈতিক উদারীকরণের কোনো ইচ্ছাই পোষণ করেন না। তিনি কাউকেই বিশ্বাস করেন না—এমনকি নিজের আশপাশের লোকদেরও না। তিনি জানেন, সামরিক বাহিনীর মধ্যেও তিনি খুব জনপ্রিয় নন। তাই তিনি সবকিছুর ওপর শতভাগ নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান।”
একজন কৃষিভিত্তিক ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা বলেন, দেশের উন্নয়ন পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের মতো দূরদৃষ্টি মিন আউং হ্লাইংয়ের নেই।
তিনি বলেন, “তৎকালীন সেনাপ্রধান থান শ্বের উত্তরসূরি হিসেবে মিন অং হ্লাইং ছিলেন একটি সমঝোতার প্রার্থী—না খুব বুদ্ধিমান, না দূরদর্শী। এখন আমাদের এমন একজন নেতৃত্ব দরকার, যার বিস্তৃত ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, বর্তমানের মতো সংকীর্ণ ‘পারিবারিক ব্যবসা’ রক্ষার মানসিকতা নয়।”
নেপিডোর শান্ত পরিবেশ দেশের অন্যান্য অংশের বাস্তবতার সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করে, যেখানে সহিংসতা ও রক্তপাত অব্যাহত রয়েছে। ইউএসডিপির এক সংসদ সদস্য স্বীকার করে বলেন, “দেশে স্থিতিশীলতা ফেরাতে শান্তি অপরিহার্য,” এবং দাবি করেন প্রেসিডেন্ট মিন আউং হ্লাইং, সরকার ও দল সবাই সমাধান খুঁজতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে চিন ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের শীর্ষ নেতা সালাই উইলিয়াম চিন এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “তারা শান্তির কথা বললেও তাদের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা অবিরাম গ্রামে বোমা হামলা চালাচ্ছে, স্কুল, উপাসনালয় ও জনবসতিতে আক্রমণ করছে, শত শত বেসামরিক মানুষ—বিশেষ করে নারী ও শিশুদের হত্যা করছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ না হলে তাদের বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।”
গণতন্ত্রপন্থী কর্মী ডা. সাসা বলেন, “আমরা কখনো মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে আলোচনা করব না, তার হাতে অনেক রক্ত লেগে আছে।” ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) সাবেক এই সদস্য বর্তমানে ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড ফেডারেল ডেমোক্রেসি নামে একটি উদ্যোগ পরিচালনা করছেন, এবং তার এই অবস্থান অধিকাংশ প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, মিন অং হ্লাইং এখনো যুদ্ধবিরতি, গৃহযুদ্ধের সমাধান ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়া কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না, কিংবা সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের আশাও তৈরি করছে না। তবে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার কোনো সম্ভাবনা আছে কি, বিশেষ করে আসিয়ান জোটের সঙ্গে?
থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে নেপিডোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে—তবে স্বীকৃতি নয়, কেবল সম্পৃক্ততা, থাই সরকারের একটি সূত্র এমনটাই জানিয়েছে। আসিয়ানের অন্যান্য সদস্যরাও একই অবস্থান নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সূত্র জানায়, মিন আউং হ্লাইং নিজেও আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী, যা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকতে পারে।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও নেপিডো সফরের জন্য আলোচনা করছেন এবং নতুন নেতার সঙ্গে বৈঠক করতে চান। একইসঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ সফরে অং সান সু চির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করার অনুরোধ জানিয়েছেন, যিনি অভ্যুত্থানের পর থেকে গোপনে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
অঞ্চলের বেশিরভাগ কূটনীতিক ও গবেষক মনে করেন, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এপ্রিলে নেপিডো সফর করতে পারেন বলে জানা গেছে। বেইজিং ইতোমধ্যে নতুন প্রেসিডেন্টকে স্বীকৃতি দিলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কিছু সংশয় রয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
চীন চাইছিল মিন অং হ্লাইং সরে দাঁড়ান এবং কোনো স্বীকৃত বেসামরিক—যদিও সাবেক সামরিক—নেতা প্রেসিডেন্ট হন। তাদের পছন্দ ছিল ইউএসডিপি প্রধান খিন ই। এতে থেইন সেইনের সময়ের মতো একটি বেসামরিকীকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যেত, যখন সেনাপ্রধান থান শ্বে অবসর নিয়ে ক্ষমতা ছাড়েন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সামরিক নয়, দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিচালনাকে বেশি পছন্দ করেন।
অং সান সু চির বিষয়ে গত পাঁচ বছরে চীনের একাধিক দূত তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। তার স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ায় আশা করা হচ্ছে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা থাইল্যান্ডের প্রতিনিধি হয়তো তাকে দেখার সুযোগ পেতে পারেন। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, কয়েক সপ্তাহ আগে জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান শ্বে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বিরোধী নেতাকে ঘিরে ‘মানবিক বিষয়গুলো’ পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তারা উপলব্ধি করছেন।
এখন আন্তর্জাতিক সফরকারীদের দিকে নজর থাকবে, তারা কোনো অগ্রগতি আনতে পারেন কি না। চীন দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারকে অং সান সু চিকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে অন্তত মানবিক সফরের সুযোগ সৃষ্টি হলেও তা বর্তমান অনমনীয় অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে নতুন সরকারের কোনো পদক্ষেপকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত এশীয় কূটনীতিক। তিনি বলেন, “নিঃশর্ত মুক্তি ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়।”
ল্যারি জাগান মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক সংবাদ সম্পাদক।
-ইরাবতী।