জাতিসংঘে দেশ ও সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্য দিলেন চাকমা সার্কেল চীফের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েন ইয়েন
![]()
নিউজ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তর-এর ইকোসক (ECOSOC) চেম্বারে “শান্তি মধ্যস্থতার মাধ্যমে হেইট স্পিচ মোকাবেলা ও প্রতিরোধে, এবং গণহত্যা ও নৃশংস অপরাধ সংঘটনের ঘটনা ও সেগুলোর প্ররোচনা প্রতিরোধে ঐতিহ্যবাহী উপজাতি ও আদিবাসী নেতা এবং জনগোষ্ঠীর জন্য মাস্কট অ্যাকশন প্ল্যান”-এর আনুষ্ঠানিক সূচনার অনুষ্ঠান (Launching Event) অনুষ্ঠিত হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন, ২০২৬) তারিখে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব এবং চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েন ইয়েন (Yan Yan) রাখাইন অংশগ্রহণ করেন। গত ১৩ জুন, ২০২৬ তারিখ সকাল ৯:৩০ ঘটিকায় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক ভেরিফাই পেইজে একটি পোস্টের মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ইয়েন ইয়েন তাঁর ফেসবুক পোস্টে উক্ত অনুষ্ঠানের ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও শেয়ার করে হুবহু নিম্নোক্ত দ্বিভাষিক, যা ইংরেজি ও বাংলা ক্যাপশনটি শেয়ার করেন:
“At the launching event of the Muscat Plan of Action for Traditional and Indigenous Leaders and Peoples in Countering and Addressing Hate Speech and Preventing Genocide and Atrocity Crimes and their Incitement through Peace Mediation.
শান্তি মধ্যস্থতার মাধ্যমে হেইট স্পিচ মোকাবেলা ও প্রতিরোধে, এবং গণহত্যা ও নৃশংস অপরাধ সংঘটনের ঘটনা ও সেগুলোর প্ররোচনা প্রতিরোধে ঐতিহ্যবাহী ও আদিবাসী নেতা এবং জনগোষ্ঠীর জন্য মাস্কট অ্যাকশন প্ল্যান-এর আনুষ্ঠানিক সূচনার অনুষ্ঠানে।
June 11.
ECOSOC Chamber, UN Headquarters, New York.
Thanks to Patrick for putting together this video.”
উক্ত ভিডিও চিত্রে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীকে চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে সম্পূর্ণ কাল্পনিক, অসত্য ও রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য প্রদান করতে দেখা গেছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনুসারীদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।
হিল নিউজ বিডি এর সহযোগিতায় জাতিসংঘের মঞ্চে প্রদত্ত ইয়েন ইয়েন-এর সেই বিতর্কিত বক্তব্যটি নিচে ইংরেজি থেকে হুবহু বাংলা অনুবাদ করা হলো:
“এখন আমি ফ্লোর প্রদান করছি হার হাইনেস রানী ইয়েন ইয়েন-কে। সম্মানিত আদিবাসী নেতা, ঐতিহ্যবাহী নেতৃবৃন্দ, বিশিষ্ট প্রতিনিধিবৃন্দ এবং সম্মানিত অতিথিবৃন্দ। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে এবং বক্তব্য রাখতে পেরে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। ‘মাস্কট প্ল্যান অব অ্যাকশন’-এর খসড়া প্রণয়নের যাত্রায় অংশ নিতে পারা আমার জন্য একটি বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। আজ আমরা এমন একটি সুনির্দিষ্ট মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি, যা আমাদের সকলকে শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সকল মানুষের মানবাধিকার রক্ষার প্রতি আমাদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার আহ্বান জানায়। মাস্কট প্ল্যান অব অ্যাকশন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা দীর্ঘদিন ধরে অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় যা বিশ্বাস করে আসছে তাকে স্বীকৃতি দেয়, তা হলো আদিবাসী নেতা এবং জনগোষ্ঠী কেবল সংঘাতের সাক্ষী মাত্র নয়; তারা সংঘাত প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার মাধ্যমে আদিবাসী নেতৃবৃন্দ সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অধিকারের স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছেন। তাঁদের প্রজ্ঞা, সাংস্কৃতিক বৈধতা, শাসন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং নিজস্ব সম্প্রদায়ের গভীর বিশ্বাস তাঁদেরকে সহিংসতার প্রাথমিক সতর্কবার্তা শনাক্ত করতে এবং যেখানে জাতিগত নিধন (Ethnocide) ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে মধ্যস্থতা করার জন্য অনন্য অবস্থানে উন্নীত করেছে। আদিবাসী সনাতন নেতৃবৃন্দ সহ সামগ্রিক আদিবাসী নেতৃবৃন্দ সংঘাত প্রতিরোধ, সমাধান এবং শান্তি বিনির্মাণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমিকার বৈশ্বিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মাস্কট প্ল্যানটি আদিবাসী নেতাদের ক্ষমতায়ন এবং দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রদান করে। যেমনটি মাত্র দুই মাস আগে এখানে নিউইয়র্কে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল, এই পরিকল্পনাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আদিবাসী নেতা ও জনগোষ্ঠীর শক্তিশালী অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে, যাতে নৃশংসতা প্রতিরোধ প্রচেষ্টার কেন্দ্রে আদিবাসীরা তাদের সঠিক স্থানটি গ্রহণ করতে পারে। এটি আদিবাসী জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে পাল্টা আখ্যান (Counter-narratives) তৈরি এবং মধ্যস্থতা করার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অর্থবহ বিনিয়োগের আহ্বান জানায়। তবে, একটি পরিকল্পনা কেবল তখনই শক্তিশালী হয় যখন এর পেছনে সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি থাকে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাধ্যবাধকতাকে এখানে বাড়িয়ে বলার সুযোগ নেই। আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণসহিংসতা, যা হেইট স্পিচ এবং উসকানির মাধ্যমে চরম রূপ নেয়, তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো: এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রায়শই পদ্ধতিগত রাষ্ট্রীয় কাঠামো দ্বারা অনুমোদিত বা প্রশ্রয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে। আমি যে দেশ থেকে এসেছি, ঠিক বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি অঞ্চলে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সামরিকায়নের (Militarization) ফলে প্রতিনিয়ত নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সেখানে এই ধরনের পরিস্থিতিতে আদিবাসী জনসংখ্যা এবং সম্প্রদায়গুলোকে একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এটি বিশেষভাবে সত্য সেই অঞ্চলের জন্য, যা গত বছর জাতিসংঘের মহাসচিব পরিদর্শন করেছিলেন, যেখানে আদিবাসী জনগণকে এখনও ‘আদিবাসী’ হিসেবে তাদের পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, মাস্কট প্ল্যান অব অ্যাকশন কেবল তখনই সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে যখন রাষ্ট্রগুলো ‘জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ (UNDRIP) অনুযায়ী আদিবাসীদের অধিকার স্বীকার, অক্ষুণ্ণ ও রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেবে। অতএব, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে রাষ্ট্রগুলো আদিবাসী নেতাদের রাজনৈতিক প্রান্তিককরণ থেকে রক্ষা করবে এবং আদিবাসী ঐতিহ্যবাহী নেতাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হেইট স্পিচের বিরুদ্ধে পাল্টা আখ্যান তৈরি ও সুরক্ষা দেবে। এমন একটি আইনি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যা আদিবাসী জনগণকে নিরাপদে বিকশিত হতে দেয় এবং অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আদিবাসী শাসন প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোগুলোকে শক্তিশালী করে আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার যেকোনো উসকানি প্রশমিত, বা সম্পূর্ণ নির্মূল করে। আমরা যখন সেই রূপকল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আসুন আমরা মনে রাখি যে মাস্কট প্ল্যান অব অ্যাকশন হলো একটি কর্মের আহ্বান। এবং আমাদের এটিকে কেবল কথার মাধ্যমে নয়, বরং টেকসই প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সম্মান জানাতে হবে, যাতে আমরা এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলতে পারি যেখানে কোনো সম্প্রদায়ই গণহত্যা, জাতিগত নিধন এবং নৃশংস অপরাধের ভয়াবহতার মুখে অরক্ষিত থাকবে না। ধন্যবাদ।”
ঐতিহাসিক সত্য বিকৃতি ও মিথ্যাচার সম্পর্কে:
ইউএন-এর মঞ্চে ইয়েন ইয়েন কর্তৃক উপস্থাপিত বক্তব্য এবং ফেসবুকে প্রচারিত তাঁর আখ্যানটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, দেশের সংবিধান এবং ঐতিহাসিক সত্যের পরিপন্থী। নিম্নে তাঁর উত্থাপিত দাবিগুলোর অসারতা ধাপে ধাপে উন্মোচন করা হলো:
ক) ‘আদিবাসী’ (Indigenous) পরিচয়ের মিথ্যা দাবি ও সাংবিধানিক সত্যতা
ইয়েন ইয়েন-এর দাবি: তিনি নিজেকে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের “আদিবাসী” (Indigenous) প্রতিনিধি এবং “রানী” হিসেবে দাবি করেছেন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদিবাসী স্বীকৃতি দিচ্ছে না বলে ফেসবুক ও বৈশ্বিক মঞ্চে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
প্রকৃত সত্য ও অনুসন্ধান হলো: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে “আদিবাসী” শব্দের কোনো অস্তিত্ব বা আইনি স্বীকৃতি নেই। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ২৩(ক) যুক্ত করা হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করিবেন।”
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: নৃবৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসমূহ এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা বা ভূ-ভূমিপুত্র (Aboriginal) নন। তারা বিভিন্ন সময়ে (প্রধানত মিয়ানমার, ভারত ও তিব্বত কিংবা মঙ্গোলীয় অঞ্চল থেকে) এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। পক্ষান্তরে, এই ভূখণ্ডের বাঙালিরাই ঐতিহাসিকভাবে হাজার বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছেন। আন্তর্জাতিক আইন (ILO Convention 1989-এর 169) এবং জাতিসংঘের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তারা ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবেই চিহ্নিত হওয়ার যোগ্য, আদিবাসী হিসেবে নয়। ইয়েন ইয়েন রাখাইন নিজে মিয়ানমার বংশোদ্ভূত হয়ে এবং প্রকৃত সত্য গোপন করে আন্তর্জাতিক ফোরামে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যে এই পরিভাষা ব্যবহার করেছেন।
খ) ‘সামরিকায়ন’ (Militarization) এবং ‘নৃশংস অপরাধ’-এর কাল্পনিক অভিযোগ সম্পর্কে:
ইয়েন ইয়েন-এর দাবি হলো: পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী সামরিকায়নের ফলে আদিবাসীদের ওপর প্রতিনিয়ত “নৃশংস অপরাধ” (Atrocity Crimes) সংঘটিত হচ্ছে।
প্রকৃত সত্য ও অনুসন্ধান হলো:
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কোনো ঔপনিবেশিক বা আগ্রাসী সামরিকায়ন নয়। এটি দেশের sovereignty রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি সাংবিধানিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ অনুযায়ী সরকার ইতিমধ্যেই সেখান থেকে বিপুল সংখ্যক অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বর্তমানে সেখানে সেনাবাহিনী অপারেশন উত্তোলনের অংশ হিসেবে কেবল কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং স্থানীয় জনগণের শিক্ষা, চিকিৎসা, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। সেখানে কোনো “নৃশংস অপরাধ” বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অস্তিত্ব নেই; বরং ইয়েন ইয়েন-এর মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি ও তহবিল পাওয়ার লক্ষ্যে এই মিথ্যা আখ্যান তৈরি করছেন।
গ) ‘জাতিগত নিধন’ (Ethnocide) ও ‘কৃত্রিম সংঘাত’-এর মনগড়া তত্ত্ব সম্পর্কে:
ইয়েন ইয়েন-এর দাবি: রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃত্রিম সংঘাত (Manufactured Conflict) তৈরি করে রেখেছে এবং সেখানে জাতিগত নিধনের ঝুঁকি রয়েছে।
প্রকৃত সত্য ও অনুসন্ধান: পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি কোনো সংঘাত থেকে থাকে, তবে তা রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট নয়; বরং তা উপজাতীয় আঞ্চলিক দলগুলোর (যেমন: জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ, এমএলপি এবং অন্যান্য উপদল ইত্যাদি) মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং আধিপত্য বিস্তারের জেরে সৃষ্ট সংঘাত। রাষ্ট্র সর্বদা এই অবৈধ সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে আসছে। পার্বত্য চুক্তির পর থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোটা সুবিধা, উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে বিশেষ অগ্রাধিকারের মাধ্যমে উপজাতীয় সম্প্রদায়কে মূলধারায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সুতরাং, “জাতিগত নিধন”-এর মতো ভয়াবহ শব্দের ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
ঘ) আন্তর্জাতিক ফোরামে মিথ্যাচারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ করা প্রসঙ্গে:
ইয়েন ইয়েন-এর দাবি: মাস্কট প্ল্যানকে কেন্দ্র করে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ হেইট স্পিচকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
প্রকৃত সত্য ও অনুসন্ধান হলো:
প্রকৃত অর্থে ইয়েন ইয়েন নিজেই এই আন্তর্জাতিক মঞ্চটিকে অপব্যবহার করে এবং ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে “হেইট স্পিচ” বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়েছেন। তিনি শান্তি ও লক্ষ্যমাত্রার আড়ালে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার বা অঞ্চলটিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ সুগম করার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চান। নিজের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই তিনি এই মনগড়া অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছেন।
প্রশাসনিক উদাসীনতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার প্রশ্ন:
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে, দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে থেকে আন্তর্জাতিক মহলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী ও শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে “গণহত্যা” বা “জাতিগত নিধন”-এর মতো গুরুতর ও বানোয়াট অভিযোগ আনা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। গত ৬ এপ্রিল রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজমা আশরাফী কথিত রানী ইয়ান ইয়ানকে এই চিঠি পাঠান। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, “তার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।” রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসকের পাঠানো চিঠির বিষয়বস্তুতে উল্লেখ করা হয়, বক্তব্য দেওয়া ও কার্যক্রম পরিচালনার সময় দেশের আইনকানুন সঠিকভাবে মেনে চলার বিষয়ে সতর্ক করতে এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। ডিসি নাজমা আশরাফী জানিয়েছেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২-এর নির্দেশেই তিনি এই চিঠি পাঠিয়েছেন, চিঠির রেফারেন্সে যার উল্লেখ রয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ইয়ান ইয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনের সদস্যদের একত্র করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোয় জড়িত। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সঙ্গেও জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।”
উক্ত চিঠি ইস্যুর পর ইয়েন ইয়েন উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অথচ রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে তিনি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরামে যুক্ত হতে পেরেছেন।
সাম্প্রতিক ফ্রান্স, কানাডা ও আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশ সফর নিয়ে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে:
দেশের বিরুদ্ধে এমন চরম বিদ্বেষী মনোভাব পোষণকারী এবং বিতর্কিত ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন ব্যক্তি কীভাবে আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার বা বক্তব্য রাখার সুযোগ পান? দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরদারি এড়িয়ে তিনি কীভাবে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যাওয়ার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক ছাড়পত্র বা ভিসা লাভ করলেন, তা অত্যন্ত রহস্যজনক এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়।
দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভাবমূর্তিকে বিশ্বমঞ্চে এভাবে ভূলুণ্ঠিত করার পরও এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুক ফুলিয়ে প্রচার করার পরও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কেন তাঁর ব্যাপারে এখনো নীরব ও উদাসীন ভূমিকা পালন করছে?
ইয়েন ইয়েন-এর এই বক্তব্য এবং ফেসবুক টাইমলাইনে এর প্রকাশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। শান্তি ও সম্প্রীতির মুখোস পরে বিশ্বমঞ্চে ও সামাজিক মাধ্যমে দেশের বিরুদ্ধে এমন কুৎসা রটনা ও মিথ্যাচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাষ্ট্র এবং দেশের প্রশাসনকে অনতিবিলম্বে এই ধরনের দেশবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।