রামগড়ের দুর্গম গরুকাটায় কৃষকের গোয়ালঘরে ইউপিডিএফের আগুন, পুড়ল গরু-হাঁস-মুরগি
![]()
ক্ষয়ক্ষতি প্রায় চার লাখ টাকা; আগের চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ ঘিরে এলাকায় উদ্বেগ
জার্নাল প্রতিবেদক
খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার দুর্গম গরুকাটা এলাকায় মধ্যরাতে এক কৃষকের গোয়ালঘরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফের দেয়া আগুনে একটি গাভি, একটি ষাঁড়, একটি বাছুর এবং ১০ থেকে ১৫টি হাঁস-মুরগি পুড়ে মারা গেছে। আগুনে গোয়ালঘরে থাকা অকটেনচালিত একটি জেনারেটরও পুড়ে যায়। এ ঘটনায় প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলার ১ নম্বর রামগড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম গরুকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক খোকন সানা (৫০) ওই এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মাদার সানা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন খোকন সানা। রাত আনুমানিক ২টার দিকে আগুনের শব্দ ও ধোঁয়ার গন্ধে তার ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে তিনি দেখতে পান গোয়ালঘরে আগুন জ্বলছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির বেশির ভাগই বের করে আনা সম্ভব হয়নি।
খোকন সানা বলেন, আগুনের শব্দ ও ধোঁয়ার গন্ধে ঘুম থেকে উঠে দেখি গোয়ালঘর আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, আগুনে একটি গাভি, একটি ষাঁড়, একটি বাছুর এবং ১০ থেকে ১৫টি হাঁস-মুরগি পুড়ে মারা গেছে। একটি গরু দড়ি ছিঁড়ে বের হয়ে যেতে সক্ষম হয়। গোয়ালঘরে থাকা অকটেনচালিত একটি জেনারেটরও পুড়ে যায়।

স্থানীয়রা এ ঘটনাকে ঘিরে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সম্প্রতি গরুকাটা এলাকায় বাঙালি পরিবারগুলোর কাছ থেকে চাঁদা দাবি ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। সেই প্রেক্ষাপটে গোয়ালঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনাটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ-এর সদস্যরা এ ঘটনায় জড়িত। তাদের দাবি, এলাকায় বসবাসরত বাঙালি পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং তাদের জমি দখলের যে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গরুকাটা ও আশপাশের এলাকায় ভূমি নিয়ে বিরোধ এবং নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে ওই এলাকার বাঙালি বসতিগুলোতে চাঁদাবাজি ও হুমকির অভিযোগও উঠেছে। অতীতে গরুকাটা এলাকায় ভূমি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব পরিষদের নেতা মো. ইউনুস জানিয়েছেন, ইউপিডিএফ ওই এলাকায় বহিরাগত কিছু পাহাড়িদের এসে বাঙালিদের জমি দখল করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় বাঙালিদের সেখান থেকে বিতাড়িত করে তাদের জমিও দখল করার চক্রান্ত হিসেবেই এই আগুন দেয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন গুচ্ছগ্রামবাসী
গরুকাটায় সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ওই এলাকার গুচ্ছগ্রামবাসীদের মধ্যে নিরাপত্তা ও ভূমি নিয়ে উদ্বেগ আগে থেকেই রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগে গুচ্ছগ্রামবাসীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভূমি বেদখলের আশঙ্কা ঠেকাতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন।
এ নিয়ে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে চাপ, হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। নিজেদের বসতভিটা ও ভূমি রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপও দাবি করেছিলেন তারা।
গরুকাটা এলাকায় ভূমি নিয়ে বিরোধের পুরোনো প্রেক্ষাপটও রয়েছে। বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে ওই এলাকায় বাঙালিদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ এবং অবৈধভাবে পাহাড়িদের বসতির অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি ছিলো ইউপিডিএফ কর্তৃক বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের আত্নীয়-স্বজনদের সেখানে নিয়ে এসে রাতারাতি বাঙালিদের জমি দখল করে বসত ঘর নির্মান করে ভুমিগুলো দখলের চেষ্টা।
ফলে বর্তমান অগ্নিকাণ্ডকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে আগুন লাগার বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রশাসন বা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করা হয়নি। আগুনের প্রকৃত কারণও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব পরিবার আগে থেকেই হুমকি, চাঁদাবাজি কিংবা ভূমি নিয়ে বিরোধের কথা জানিয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছে, তাদের অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।