টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র: পরিত্যক্ত ফেলে রাখায় লাভ হতে পারে ভারতের

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র: পরিত্যক্ত ফেলে রাখায় লাভ হতে পারে ভারতের

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র: পরিত্যক্ত ফেলে রাখায় লাভ হতে পারে ভারতের
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন দুই দফা বিস্ফোরণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই বন্ধ রয়েছে গ্যাসক্ষেত্রটি। এ নিয়ে স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আইনি জটিলতা নাকি সীমান্তের ওপারের অদৃশ্য কোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণে এটি বন্ধ—এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মাঝে। আজ ২৪ জুন টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ট্র্যাজেডির দ্বিতীয় দফা ভয়াবহ বিস্ফোরণের ২১ বছর পূর্তি হচ্ছে। দীর্ঘ এই সময়ে খনিটি সচল করার কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নিয়ে রহস্যের দানা বাঁধছে।

জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভার সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র। একসময় ছাতক সিমেন্ট কারখানার পাশাপাশি ছাতক পাল্প ও কাগজ কারখানা চলত টেংরাটিলার গ্যাসে। এই গ্যাসক্ষেত্র অচলাবস্থায় ফেলে রাখার পেছনে প্রতিবেশী ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ও খনিজ স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে সীমান্ত সংলগ্ন জনপদে।

ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র এলাকা থেকে ভারতের সীমান্তরেখা এবং মেঘালয়ের খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ পাহাড়ি অঞ্চলের আকাশপথের দূরত্ব মাত্র ৭-১০ কিলোমিটার (কিমি), যা ভূগর্ভস্থ গ্যাস রিজার্ভারের গঠনের দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল যৌথ সীমান্ত আধার হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

খনিজ বিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচের গ্যাস বা তেলের সুনির্দিষ্ট কাঁটাতারের সীমানা থাকে না, বরং এক সীমানার খনি বন্ধ রেখে তার মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে ওপারে যদি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রিলিং বা গ্যাস উত্তোলন প্রকল্প চালানো হয়, তবে ‘ড্রেনেজ ইফেক্ট’-এর কারণে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা গ্যাস প্রাকৃতিকভাবেই সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ওপারে চলে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক আশঙ্কা প্রবল।

২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথম দফা এবং ২৪ জুন দ্বিতীয় দফা টেংরাটিলায় বিস্ফোরণ হয়। এরপর নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘ইকসিড’ (ICSID) কানাডীয় কোম্পানি নাইকোকে দায়ী করে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় দিলেও খনিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্র এখনো নির্বিকার।

স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ২১ বছর ধরে এই খনিটি অলস ফেলে রাখার সুযোগে ওপার থেকে ভারত ক্রমাগত তাদের সীমান্তে খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলন সচল রেখেছে, যার ফলে দেশের বিলিয়ন ডলার মূল্যের জাতীয় সম্পদ নীরবে হাতছাড়া হয়ে ভারতের পকেটে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে তীব্র সংশয় দানা বাঁধছে। দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে চড়া দামে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হলেও ভারতের স্বার্থ রক্ষা বা কোনো অদৃশ্য আন্তর্জাতিক চাপেই কি টেংরাটিলার বিপুল গ্যাস মজুত মাটির নিচে রেখে নষ্ট করা হচ্ছে—এমন প্রশ্ন তুলে অবিলম্বে এই খনির ভূগর্ভস্থ সুরক্ষায় নতুন করে সমীক্ষা ও খনিটি সচল করে দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে আসার দাবি তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

টেংরাটিলা গ্রামের শের মাহমুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘দুই দফা অগ্নিকাণ্ডের পর টেংরাটিলা ও এর আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশগত যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা দুই দশকেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের আজ অবধি পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। আমরা বছরের পর বছর ধরে আশায় আশায় আছি, কবে এই খনিটি আবারো চালু হবে। কিন্তু খনিটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ বলেন, ‘সম্প্রতি বাপেক্সের এমডিসহ উচ্চপর্যায়ের টিম টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। তবে কবে নাগাদ এই গ্যাসক্ষেত্রটি চালু হবে, সুনির্দিষ্টভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি। এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি, পরিত্যক্ত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি সচল করে উৎপাদনে নিয়ে আসা হোক।

হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক ও পরিবেশকর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘প্রায় দুই দশক ধরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। নতুন করে সমীক্ষা চালিয়ে গ্যাসক্ষেত্রটিকে দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে আসার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র চালুর বিষয়ে কোনো ধরনের নির্দেশনা আমাদের কাছে এখনো আসেনি। এ বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দেশনা থাকলে বাপেক্স বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’

এ বিষয়ে জানতে বাপেক্সের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের ইনচার্জ প্রকৌশলী এমএম নাজিম উদ্দিনের মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

-আমার দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *