নতুন শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগে ভরসা মিন অং হ্লাইংয়ের

নতুন শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগে ভরসা মিন অং হ্লাইংয়ের

নতুন শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগে ভরসা মিন অং হ্লাইংয়ের
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারে নতুন শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা এবং নিজের ক্ষমতার ভিত্তি আরও সুসংহত করতে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছেন দেশটির সামরিক শাসক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে (Global Initiatives) একযোগে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তিনি বেইজিংয়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অংশীদারত্বের বার্তা দিয়েছেন এবং নিজের কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য চীনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমর্থন আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছেন।

গত মাসে চীন সফরকালে মিন অং হ্লাইং গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (GSI), গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (GCI) এবং গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (GGI)—এই চারটি উদ্যোগের আওতায় পৃথক সমঝোতা স্মারকে (MoU) স্বাক্ষর করেন।

জান্তা সরকারের মুখপাত্র খাইং খাইং সোয়ে জানান, অন্যান্য দেশ যেখানে এসব উদ্যোগের মধ্যে এক বা দুটি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, সেখানে মিয়ানমারই একমাত্র দেশ, যারা চারটি উদ্যোগেই একযোগে যুক্ত হয়েছে।

চীন এসব উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক জনকল্যাণ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের মতে, এগুলোর মাধ্যমে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ নীতির আড়ালে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোকে কূটনৈতিক বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে বেইজিং তার বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি পশ্চিমা নেতৃত্বের প্রভাব কমিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তঃদেশীয় অপরাধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেসন টাওয়ার বলেন, মিন অং হ্লাইংয়ের এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, তিনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জান্তা সরকারকে একঘরে করে দিলে চীনই তাদের প্রধান রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সমর্থকে পরিণত হয়।

বিশেষ করে ২০২৫ সালে বেইজিংয়ের সমর্থন আরও জোরালো হয়। ওই সময় চীনের চাপে শক্তিশালী ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (UWSA) এবং ঐতিহ্যগতভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা কয়েকটি জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন মিয়ানমারের প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম (GI-TOC)–এর জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ জেসন টাওয়ার বলেন, “ক্ষমতার শীর্ষে নিজের অবস্থান সুসংহত করার ক্ষেত্রে মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য চীনের অব্যাহত সমর্থন এখন প্রায় অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এই সমর্থনের বিনিময়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতাধীন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মিয়ানমারে কর্মরত চীনা নাগরিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

নিরাপত্তা উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব

চারটি উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (GSI)-কে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প বর্তমানে সংঘাতপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত।

২০২২ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জিএসআই ঘোষণা করেন। এই উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক সরকার ২০২৩ সালেই এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানায়। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলায় এটি জান্তা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

চীন ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত মিয়ানমারের বহুল সমালোচিত নির্বাচনকেও সমর্থন দেয় এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত মিন অং হ্লাইংয়ের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়, যদিও বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

জেসন টাওয়ারের ভাষায়, “জিএসআইকে ঘিরে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং সবচেয়ে বড় যে সুবিধা পাচ্ছেন, তা হলো—চীন তাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।”

নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তারের ইঙ্গিত

পর্যবেক্ষকদের মতে, বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যৌথ অঙ্গীকার ভবিষ্যতে মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে সরাসরি নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

এ লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের জান্তা সরকার প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসেস আইন প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে চীনা বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে মিয়ানমারে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প এবং চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে যৌথ উদ্যোগে একটি নিরাপত্তা কোম্পানি গঠনের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল।

যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাখাইনের কিয়াউকফিউ থেকে মান্দালয়, মাগওয়ে ও উত্তর শান অঙ্গরাজ্য হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চীন-মিয়ানমার তেল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করবে।

দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার ও এশিয়া নিয়ে কাজ করা প্রবীণ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক বার্টিল লিন্টনার বলেন, জিএসআইতে মিন অং হ্লাইংয়ের অঙ্গীকার ভবিষ্যতে মিয়ানমারে চীনা বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, “বর্তমানে মিয়ানমারে চীনা নিরাপত্তা কোম্পানির সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে নতুন এসব চুক্তির পর ভবিষ্যতে তাদের উপস্থিতি আরও বাড়বে বলে আমি মনে করি।”

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *