হরমুজের পর ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিও বন্ধের ইঙ্গিত, ইরানের নতুন কৌশল ঘিরে উদ্বেগ

হরমুজের পর ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিও বন্ধের ইঙ্গিত, ইরানের নতুন কৌশল ঘিরে উদ্বেগ

হরমুজের পর ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিও বন্ধের ইঙ্গিত, ইরানের নতুন কৌশল ঘিরে উদ্বেগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল ডেস্ক

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত ব্যাহত হওয়ার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও কৌশলগত চাপের অংশ হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তেহরানের বার্তা, প্রয়োজন হলে ইয়েমেনের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাও আরও তীব্র হতে পারে। পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে সামরিক অভিযান জোরদার করছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধেও হামলা বাড়িয়েছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত করার কৌশল নিয়েছে তেহরান।

তাদের মতে, শুধু পারস্য উপসাগর নয়, লোহিত সাগরকেও সংঘাতের আওতায় এনে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়াতে চাইছে ইরান। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব দেখানোর পর বাব আল-মান্দেবকে দ্বিতীয় চাপের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা এ জলপথ দিয়ে সৌদি আরবের বিপুল তেল রপ্তানি এবং বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাতে জানা যায়, সোমবার ইয়েমেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের পথে হাঁটবে। তার দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন হুতি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ। তার অভিযোগ, ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাতে সৌদি আরবকে উৎসাহিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুই প্রণালিতেই সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তারও দাবি, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস রয়টার্সকে বলেন, প্রয়োজন হলে ইরান সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। তার মতে, তেহরান ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাইছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথকেই একই সময়ে ঝুঁকির মুখে ফেলতে তাদের সক্ষমতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয়; বরং এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের মাধ্যমে সংঘাত ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকবে। উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেল পরিবহন পথ দীর্ঘ সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের ওপর আবারও আলোচনায় ফেরার আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রস বলেন, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তার মতে, শুধু আলোচনা শুরু করাই নয়, উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমঝোতায় পৌঁছানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, বাব আল-মান্দেব নিয়ে হুতিদের সাম্প্রতিক হুমকি ইরানের একটি চূড়ান্ত কৌশলের অংশ হতে পারে। তিনি বলেন, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যদি মনে করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত এড়ানো সম্ভব নয়, তখন তারা এ পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা আরও বাড়ায়, তাহলে তেহরান হুতি মিত্রদের ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে।

সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তবে তারা এটাও উপলব্ধি করছে যে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। তার ভাষ্য, ইরান জিতুক বা হারুক—উভয় পরিস্থিতিতেই মধ্যপ্রাচ্যকে বড় মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাব আল-মান্দেবে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টির সক্ষমতা হুতিদের থাকলেও তেহরানের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া তারা এমন পদক্ষেপ নেবে বলে মনে হয় না। যদি তারা আবার আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বড় হুমকি তৈরি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আরও বড় সামরিক অভিযান চালাতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে দেখিয়েছে যে, তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ওই সময় হামলার কারণে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ পরিবহন কোম্পানিগুলোকে লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়, ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুটিই বেড়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় বহুজাতিক নৌ অভিযান শুরু করে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *