শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: ত্যাগ ও অর্জনের এক অনন্য অধ্যায়
![]()
লে. কর্নেল হাসানুর রহমান, বিজিওএম, পিএসসি
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিশ্ববাসী দুটি বড় যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করে। ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলমান প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় দুই কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সভ্যতার আলোয় বিকশিত অনেক শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয় এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯২০ সালের ২০ জানুয়ারি গঠিত হয় জাতিপুঞ্জ।
পরবর্তীতে বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ব্যাপক পরিবর্তন, বৃহৎ শক্তির স্বার্থপরতা, সাংগাঠনিক দুর্বলতাসহ নানাবিধ কারণে জাতিপুঞ্জ তার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৩৯ সালে বিশ্ববাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে। এই যুদ্ধ সংঘটনের প্রেক্ষিতে জাতিপুঞ্জ তার কার্যকারিতা হারায় এবং ১৯৪৬ সালে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে।
১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলমান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল বর্ণনাতীত। মানুষের দুর্দশা ছিল সীমাহীন। এই যুদ্ধে প্রায় ৯ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পৃথিবীর উন্নত ও সভ্যতার আলোয় উদ্ভাসিত শহরগুলো ধুলোয় মিশে যায়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক হামলার দরুন সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দেয়। বিশ্ব নেতারা অনুভব করেন, এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলে মানব সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য।
বিশ্ব রাজনীতির এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর মাত্র ৫১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয় জাতিসংঘ নামের এই আন্তর্জাতিক সংস্থার। যেটির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে এই সংস্থার সদস্য সংখ্যা ১৯৩টি, যা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১১টি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন চলমান রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রথম শান্তি মিশন শুরু হয় ১৯৪৮ সালের মে মাসে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ ইউনাইটেড নেশন্স ট্রস সুপারভিশন অর্গানাইজেশন নামে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠায়, যাদের কাজ ছিল মূলত যুদ্ধ বিরতি পর্যবেক্ষণ করা। এছাড়া তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট পাঠানোসহ অন্যান্য মিশনকে সহায়তা করাও এই মিশনের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটা মূলত কোনো যুদ্ধ ফোর্স ছিল না, বরং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগদান করে ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে। ইরাক-ইরান সীমান্তে পরিচালিত টঘওওগঙএ মিশনে ১৫ জন সেনা পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ শান্তি মিশনে তাদের গৌরবোজ্জ্বল পদযাত্রা শুরু করে। এটা ছিল সীমিত পরিসরে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ।
পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে আফ্রিকার দেশ নামিবিয়ায় পরিচালিত শান্তি মিশন ‘আনটাগ’ বা ‘ইউনাইটেড নেশনস ট্রানজিশন এসিসট্যান্স’ গ্রুপে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য নামিবিয়া মিশন ছিল একটা বিশাল মাইলফলক। ১৯৮৯-১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলমান এই মিশন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বড় মাপের কোনো সফল মিশন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম ধৈর্য্য, বিচক্ষণতা ও পেশাদারিত্বের জন্য ১৯৮৯ সালে নামিবিয়ায় একটি সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে প্রায় ৪২ হাজার নামিবীয় শরণার্থী নিরাপদে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের অবসান ঘটে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রভাব বলয় থেকে বের করে নামিবিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল এই মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়।
এই মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের নাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সততা, দায়িত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মানবোধ, পেশাদারিত্ব ও শৃংখলার জন্য জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তিরক্ষা মিশনের আইকন হয়ে ওঠে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫৪টির বেশি জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ করেছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা সরবারাহ করার গৌরব অর্জন করেছে বেশ কয়েকবার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এমন অর্জন দেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্ব দরবারে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জিং মিশনে অংশগ্রহণ করে অত্যন্ত উন্নত মানের পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়। ডিআর কঙ্গোঁতে অনুষ্ঠিত মনুসকো শান্তি মিশন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম দীর্ঘ এবং কঠিন একটি মিশন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই মিশনে অংশগ্রহণ করে। কঙ্গোতে প্রায় শতাধিক সশস্ত্র গ্রুপ বিদ্যমান ছিল। এই বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও তাদের গেরিলা আক্রমণ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়।
ডিআর কঙ্গো আয়তনের দিক থেকে একটি বড় দেশ। দেশটির দুর্গম ভৌগলিক পরিবেশ, অপ্রতুল রাস্তাঘাট, জঙ্গল, পাহাড়, সংক্রামক রোগের উপদ্রব, অসামরিক অসন্তোষ লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন প্রভৃতি বিষয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শান্তি মিশন পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় এবং তাদের এই পেশাদারিত্ব সর্বমহলে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে।
এছাড়া ডিআর কঙ্গোতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত লেভেল-২ হাসপাতাল স্থানীয়দের চিকিৎসাসেবা দিয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলো দুর্গম জঙ্গলে রাস্তাঘাট নির্মাণ করে এবং ফিমেল কন্টিনজেন্ট নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলার মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কঙ্গোর এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বাংলাদেশ সোনাবাহিনীর বিশাল ও সরব উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনে।
সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘ পরিচালিত শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলা এই মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে শান্তি মিশনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো এখনো উদাহরণ হিসেবে দেখে। এই মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণে রাজি করা এবং কখনো সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘের ম্যান্ডেট রক্ষার ক্ষেত্রে জীবনবাজি রেখে কাজ করে।
এছাড়া যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিয়েরা লিওনে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ, সরকারি স্থাপনাগুলো সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। খাদ্য ও ঔষধ বিতরণ, চিকিৎসা সেবা, ছোট ছোট স্কুল তৈরি করে বাচ্চাদের শিক্ষালাভের সুযোগ করে দেওয়া ইত্যাদি গণমুখী কার্যক্রম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০০৩ সালে লাইবেরিয়ার জাতিসংঘের শান্তি মিশন আনমিল শুরু হয়। এই মিশনে বাংলাদেশ অন্যতম শান্তিরক্ষা প্রেরণকারী দেশ। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত লাইবেরিয়াতে বিদ্রোহীরা অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী ছিল। বাংলাদেশের সেনা সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে হাজার হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহীকে অস্ত্র সমর্পণ করতঃ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সফলতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। লাইবেরিয়ার বিরুপ পরিবেশ, স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতিসংঘের ম্যান্ডেট রক্ষায় সফলতা অর্জন করায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পেশাদারিত্বের জন্য ‘Reliable and Dedicated’ (অসাধারণ ও ঈর্ষণীয়) বাহিনী হিসেবে জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, যা দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে।
এছাড়া রাস্তাঘাট, এয়ারফিল্ড, ব্রিজ, হেলিপ্যাড তৈরি, স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণ প্রদান, স্থানীয় যুবকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, জেনারেটর রিপেয়ারিং এবং সেলাইয়ের কাজে দক্ষ করে তোলা, স্থানীয়দের চিকিৎসাসহ মানবিক সহয়তা প্রদান করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ লাইবেরিয়ার সরকার গবাবঙ্গাঁ শহরে ‘বাংলাদেশ স্কয়ার’ নামের স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করে।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ সেনাবহিনী কন্টিনজেন্ট ,মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে শান্তিরক্ষা মিশনে গমন করে। বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করনে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা জুকোম্বো এলাকায় অপারেশন ‘পোপু’ পরিচালনা করে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের পরাজিত করে সাধারণ জনসাধারণের চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। এছাড়া রাজধানী বাঙ্গুই থেকে ক্যামেরুন সীমান্ত পর্যন্ত ৬১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি বিদ্রোহীদের অভয়ারণ্য ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই সড়ক পথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করে, যা বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়। দুর্গম এলাকায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইন ও ঔষধ বিতরণ, স্থানীয়দের জন্য স্কুল নির্মাণ, মসজিদ,মন্দির, গির্জা সংস্কারকরণ, যুবকদের জন্য প্রীতি ম্যাচ আয়োজন , শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মতো সামাজিকি কার্যক্রম পরিচালনা করায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে স্থানীয় জনসাধারণ হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান করে নেয়।
জাতিসংঘের মাল্টি ডাইমেনশনাল ইমিগ্রেটেড স্টাবিলাইজেশন মিশন ছিল জাতিসংঘের ঝূঁকিপূর্ণ ও জটিল মিশনগুলোর একটি। বিদ্রোহীদের চোরাগোপ্তা হামলা, আইইডি বিস্ফোরণ ও যত্রতত্র অ্যামবুশ পরিচালনা ছিল শান্তিরক্ষীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চরমাভাবাপন্ন আবহাওয়া, কৌশলগত ও রাজনৈতিক জটিলতা, ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা মালি মিশনকে জটিল করে তোলে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে আভিযানিক সফলতা অর্জন করে। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা মানবিক ও সমাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ভাতৃত্ববোধের বন্ধন সুদৃঢ়করণের মাধ্যমে স্থানীয়দের মন জয় করতে সক্ষম হয়। এই মিশনে অংশগ্রহণকারী ব্যাননব্যাট-১ তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে, যা বিশ্ব পরিমন্ডলে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
জাতিসংঘ শান্তি মিশন পরিচালনাকালীন বাংলাদেশ সেনাবহিনী বহুমুখী সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে থাকে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বিপজ্জনক পরিবেশ, অপ্রত্যাশিত হামলা বা আইইডি বিস্ফোরণ অত্যতম। এছাড়া ভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির একটি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপনও একটি বড় প্রতিকূলতা। এলাকাভিত্তিক রোগের প্রাদুর্ভাবও ক্ষেত্র বিশেষে শান্তিরক্ষীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মূলত এসব সমস্যা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্ব শান্তি রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের সুবাদে বাংলাদেশ পৃথিবীব্যাপী পরিচিতি লাভ করে, যা কুটনৈতিক সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। বাংলাদেশ একাধিকবার সর্বাধিক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের সম্মান অর্জন করে। ২৮ নভেম্বর ২০২৫ সালে জাতিসংঘ তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কাজের প্রশংসা করে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে পোস্ট করে। সেখানে বলা হয়, ‘বিশ্ব জুড়ে চলা শান্তি মিশনে বাংলাদেশের ৫৬০০ এর অধিক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা ‘সার্ভিস ফর পিস’- এ কাজ করছেন। তারা তাদের পরিবারকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা এই সাহসী নারী ও পুরুষদের (বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী) তাদের সেবা ও ত্যাগের জন্য ধন্যবাদ জানাই।’ বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও গৌরবের।
২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনের মজ্জা হিসেবে উল্লেখ করে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম প্রতিষ্ঠান BIPSOT পরিদর্শনে বাংলাদেশি পিস কিপারদের উচ্ছসিত প্রশংসা করে। বাংলাদেশকে বিশ্ব শান্তির রোল মডেল বলে উল্লেখ করেন। BIPSOT হলো শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের জন্য জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে এমন গৌরবোজ্জ্বল অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ত্যাগের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ব শান্তি রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৭৪ জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। অনেকে আহত হয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
২০০৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর বেনিন দুর্ঘটনায় দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের ১৫ জন শান্তিরক্ষী শাহাদাত বরণ করেন। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনের সর্বাপেক্ষা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে ২০০৫ সালে। ডিআর কঙ্গোর সশস্ত্র বিদ্রোহীরা ৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং একই মিশনে ২০১৩ সালে আরও ৩ জন শান্তিরক্ষী শাহাদাৎ বরণ করেন।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানের আবেই-এ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উপর ড্রন আক্রমণ চালায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এই আক্রমণে ৬ জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অকুতোভয় শান্তিরক্ষী শাহাদাত বরণ করেন। এভাবেই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় মুহূর্তে বাংলাদেশের সেনা সদস্যরা বুকের রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধা করেননি কখনো।
বিশ্ব পরিমন্ডলে বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় দেশ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠায় দক্ষ একটি বাহিনী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেমন দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে আত্মোৎসর্গ করতে দায়বদ্ধ, তেমনি বিশ্ব শান্তি রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে অকুতোভয়।
এভাবেই জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনী। এজন্যই স্বীয় গুণে গুণান্বিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সত্যিকার অর্থেই আমাদের গর্ব, দেশের অহংকার।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।