সাঙ্গু নদী: সেনাবাহিনীর উন্নয়নযজ্ঞ ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রাণরেখা

সাঙ্গু নদী: সেনাবাহিনীর উন্নয়নযজ্ঞ ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রাণরেখা

সাঙ্গু নদী: সেনাবাহিনীর উন্নয়নযজ্ঞ ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রাণরেখা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

লে: কর্নেল নূর মো. সিদ্দিক সেলিম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত দেশের বৃহত্তম পাহাড়ি অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত এ অঞ্চল ভৌগোলিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়, বনভূমি, বহমান নদী ও ঝরনার সমন্বয়ে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক রূপ যেন এক অনন্য সৃষ্টিকর্ম। পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে; যার মধ্যে চাকমা, মারমা, ম্রো, বম, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, তঞ্চঙ্গ্যা ও কুকি উল্লেখযোগ্য। সবাই তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে একসঙ্গে বসবাস করে এলেও জীবনমান উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তারা সর্বদাই সোচ্চার।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। পাশাপাশি এ এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৯৭৬ সাল থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স নিয়োজিত রয়েছে। বর্তমানে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সের ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সাঙ্গু নদীর তীরঘেঁষে অবস্থিত বান্দরবান জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ৩৪৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১০৫ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৪৪ কিলোমিটারের কাজ প্রক্রিয়াধীন।

এ ছাড়া সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী থানচি-আলীকদম, থানচি-চিম্বুক, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি ও বান্দরবান-রুমা সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড নিয়োজিত রয়েছে। উল্লিখিত প্রকল্পগুলোর কাজ অনেকাংশে সাঙ্গু নদীর পানি ও বালি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য সাঙ্গু নদী এবং এর সঙ্গে যুক্ত ঝিরিগুলো প্রধান ভরসা। এ ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় এই নদীর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সাঙ্গু নদীর তীরঘেঁষে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বিজিবির গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চৌকি। এই নদী ও আশপাশের ঝিরি ব্যবহার করে বিজিবি গহিন জঙ্গলে দ্রুত টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ অন্যান্য সব কার্যক্রম রোধ এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরেই বান্দরবান ও এর আশপাশের মানুষের জন্য সাঙ্গু নদী একটি সহজ ও কার্যকর বিকল্প পরিবহন পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। থানচি থেকে মদক পর্যন্ত নৌকা চলাচল এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। নদীপথে মালামাল পরিবহন সহজ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব বিধায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন মাধ্যম। একই সঙ্গে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের অনেক জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা। থানচি, রিমাকরি, নাফাখুম ও আমিয়াখুম জলপ্রপাত, তিন্দু সংলগ্ন বড় পাথরের মতো দশর্নীয় স্থানগুলো এই নদীর তীরবর্তী সৌন্দর্যের বিস্ময়ে আঁকা। নদীপথে নৌকা ভ্রমণ, ক্যাম্পিং এবং স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর এবং আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

পানির ওপর দিয়ে চলা বাঁশের ভেলা, দুই পাশের সবুজ পাহাড়, ঝিরিপথ ও ঝরনার কলকল ধ্বনি তৈরি করে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সাঙ্গু নদীকে ঘেরা অপরূপ বৈচিত্র্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, গাইড, নৌকাচালক ও দোকানিরা সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হন এবং এর মাধ্যমে পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়ে ওঠে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

সাঙ্গু নদী বর্ষাকালে শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত থাকলেও শীতকালে এ নদীর পানি প্রবাহ অনেকটাই কমে যায়। অনেক স্থানে নদীর তলদেশ প্রায় শুকিয়ে যায়; যা প্রাকৃতিক সৃষ্ট কারণের চেয়ে মূলত মানবসৃষ্ট কারণেই হয়ে থাকে। এই পানি সংকটের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অপরিকল্পিত জুম চাষ, বনভূমি ধ্বংস এবং পানি সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকাই উল্লেখযোগ্য। নদীর পানি কমে যাওয়ায় সামাজিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে। যেমন বিজিবির সীমান্ত নজরদারি ও দ্রুত টহল কার্যক্রম সক্ষমতা হ্রাস পায় ও সীমান্তে চোরাচালান বা অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাঙ্গু নদীকে টিকিয়ে রাখা এবং শীতকালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সবই সাঙ্গু নদীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই সাঙ্গু নদীকে বাঁচানো মানে পাহাড়কে বাঁচানো। নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য কয়েকটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করে রাবার ড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত জুমচাষ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে স্থানীয় জনগণকে উৎসাহিত করা ও বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া, নদী সংলগ্ন ঝিরির দুই পাশের বনভূমি সংরক্ষণের ব্যাপারে নদীর তীরবর্তী ও এর আশপাশের মানুষকে প্রয়োজনীয় প্রেষণা প্রদান করা এবং নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালি উত্তোলন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

লেখক: প্রকল্প পরিচালক একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প, বিপিএটিসি, সাভার সেনাসদর, ই ইন সির শাখা, পূর্ত পরিদপ্তর