বন্যার ক্ষত না শুকাতেই কিস্তির চাপ, পেকুয়ায় এনজিওর বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের অভিযোগ

বন্যার ক্ষত না শুকাতেই কিস্তির চাপ, পেকুয়ায় এনজিওর বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের অভিযোগ

বন্যার ক্ষত না শুকাতেই কিস্তির চাপ, পেকুয়ায় এনজিওর বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের অভিযোগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

কক্সবাজার প্রতিনিধি

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি, ফসল, মাছের ঘের ও ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়া কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার হাজারো মানুষ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) নিয়মিত ক্ষুদ্রঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না এনে কিস্তি আদায় করায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

সরেজমিনে পেকুয়া সদর, রাজাখালী, মগনামা, উজানটিয়া, টৈটং ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক পরিবার এখনও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও ঘরের মেঝেতে কাদা, কোথাও নষ্ট হয়ে আছে আসবাবপত্র। কৃষকের বীজতলা, আমন ধানের জমি, লবণের মাঠ ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আয়ের উৎস সংকুচিত হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পুঁজি হারিয়ে সংকটে রয়েছেন। এর মধ্যেই সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধের চাপ তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

ঋণগ্রহীতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দিনে এনজিও কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তি আদায় করছেন। অনেক ক্ষেত্রে কিস্তি দিতে না পারলে বারবার ফোন করা হচ্ছে, গ্রুপ সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। নতুন ঋণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখিয়েও অনেককে কিস্তি পরিশোধে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

রবিববার (২০ জুলাই) সকালে পেকুয়া উপজেলার মইয়্যাদিয়া, টেকপাড়া ও পূর্ব গোঁয়াখালী এলাকায় দেখা যায়, ব্র্যাক, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে), উদ্দীপনসহ একাধিক এনজিও বন্যাকবলিত এলাকাতেও ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি সংগ্রহ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যরা আর্থিক সংকট ও কর্মহীনতার কথা জানিয়ে কিছুটা সময় চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের ওপর কিস্তি পরিশোধের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পেকুয়া পৌরসভার টেকপাড়া এলাকার বাকপাড়ার বাসিন্দা শাহেদা বেগম বলেন, ‘আমার বাবা মৃত্যুশয্যায় হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায়ও নির্ধারিত দিনে এনজিও কর্মীরা বাড়িতে গিয়ে কিস্তি আদায় করেন। পরিবারের সদস্যরা পরিস্থিতির কথা জানালেও কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত স্বজনদের কাছ থেকে টাকা এনে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়েছে।’

বন্যার ক্ষত না শুকাতেই কিস্তির চাপ, পেকুয়ায় এনজিওর বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের অভিযোগ

আকতার আহমদ বলেন, ‘একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আমি অটোরিকশা কিনেছিলাম। বন্যার সময় বাড়িতে পানি ওঠায় পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবর্তে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে হয়। কয়েকদিন কোনো আয় ছিল না। পানি নেমে যাওয়ার পর ঘর মেরামতের কাজ চলাকালেই এনজিওর কর্মীরা কিস্তি নিতে আসেন। আয় না থাকার কথা জানালেও কোনো ছাড় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ধার করে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়েছে।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক ঋণগ্রহীতা। তাদের দাবি, কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে, কেউ স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে কিস্তি পরিশোধ করছেন। এতে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পরিবর্তে নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়ছে।

সম্প্রতি বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জুলাই মাসজুড়ে ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছিলেন বন্যা তদারকি ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। পাশাপাশি দুর্গত জেলাগুলোতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সেই ঘোষণার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

বন্যার কারণে উপজেলার দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, জেলে, অটোরিকশাচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখনও নিয়মিত আয় করতে পারছেন না। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজার ব্যবস্থাও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে সংসার চালানোর পাশাপাশি সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ তাদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের জন্য কিস্তি আদায় স্থগিত রাখা, বিলম্ব ফি মওকুফ এবং ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হোক। পাশাপাশি কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সহজ শর্তে পুনর্বাসন ঋণ এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনজিও ফোরামের এক নেতা বলেন, কয়েকটি সংস্থার শাখা ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের দাবি, বন্যাদুর্গত এলাকায় কিস্তি আদায়ে শিথিলতা আনা হয়েছে এবং যারা স্বেচ্ছায় কিস্তি দিতে আগ্রহী, শুধু তাদের কাছ থেকেই অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোনো ঋণগ্রহীতার ওপর জোরপূর্বক কিস্তি আদায়ের নির্দেশনা নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকায় ঋণের কিস্তি আদায়ের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *