চট্টগ্রামের ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী?

চট্টগ্রামের ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী?

চট্টগ্রামের ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরের এক পরিত্যক্ত জায়গায় পড়ে থাকা একটি রাইফেল উদ্ধার। সাধারণ চোখে সামান্য এক উদ্ধারের খবর মনে হলেও, অস্ত্রটি ঘিরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। উপমহাদেশে যে অস্ত্রের ব্যবহারই নেই, তা চট্টগ্রামের রাস্তায় এল কীভাবে?

জার্মানির তৈরি সামরিক গ্রেডের এইচকেজি-থ্রি রাইফেলটি ঘিরে গোয়েন্দাদের বিশ্লেষণ যেখানে পৌঁছেছে, তাতে নাম উঠে আসছে দুটি—পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠী আর মিয়ানমারের আরাকান আর্মি।

গত ২৪ জুন সকালে চান্দগাঁও থানার হাজীরপুল ফেদা পুকুরপাড় থেকে বাট ও ম্যাগাজিনবিহীন অবস্থায় রাইফেলটি উদ্ধার করে র‍্যাব। উদ্ধারের পরপরই এই অস্ত্র নিয়ে তৈরি হয় কৌতূহল—কারণ এমন অস্ত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার তো দূরের কথা, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই এর কোনো প্রচলন নেই।

যে অস্ত্র উপমহাদেশে ব্যবহারই হয় না

জার্মানির হেকলার অ্যান্ড কক কোম্পানি ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধকালীন রাইফেল হিসেবে এইচকেজি-থ্রি তৈরি করে। অতি মাত্রায় ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ও নিখুঁত নিশানার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই অস্ত্র প্রতি মিনিটে ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে সক্ষম, আর প্রায় এক কিলোমিটার দূরের নিশানাতেও আঘাত হানতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশের সশস্ত্র বাহিনী এটি ব্যবহার করে বলে তথ্য মিলেছে।

কিন্তু মিয়ানমারের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সাবেক হেড অব মিশন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, ‘ভারত, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, পাকিস্তান কোথাও এই অস্ত্রের সচরাচর ব্যবহার নেই।’

র‍্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানও একই কথা বলেন—বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কারখানায় একসময় জি-থ্রি রাইফেল তৈরি হলেও, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি সেই ধরনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দেশের কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই এই ক্যালিবারের অস্ত্র ব্যবহার করে না।

ঠিক এই কারণেই এমদাদুল ইসলামের ভাষায়, “কোত্থেকে আসল, কীভাবে আসল, কারা এখানে সরবরাহ করল, কৌতূহল থাকাটা খুব স্বাভাবিক।”

পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীর দিকেই ইঙ্গিত

দেশীয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা এক অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বিধান বড়ুয়ার কাছ থেকে একবার এইচকেজি-থ্রি রাইফেল উদ্ধার হয়েছিল। এরপর গত ১৫ বছরে এ ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের আর কোনো তথ্য নেই।

তার ধারণা, সাম্প্রতিক উদ্ধার হওয়া রাইফেলটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ অথবা রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হাত থেকে আসতে পারে, যেখান থেকে তা পৌঁছাতে পারে অপরাধ জগতের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের কাছে।

সিএমপি ও জেলা পুলিশে কাজ করা আরেক অবসরপ্রাপ্ত এএসপির ভাষ্য, “রেঞ্জ বেশি, হেভি আর্মস—এজন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গ্রুপগুলো এই অস্ত্র খুব বেশি ব্যবহার করত। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছেও এমন অস্ত্র ছিল।”

পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র বিক্রি করছে আরাকান আর্মি!

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বটি সামনে আনছেন মেজর এমদাদুল ইসলাম—সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাত পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে। তার বিশ্লেষণ, বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর জান্তা বাহিনী রাখাইনে পণ্য আসার অভ্যন্তরীণ তিনটি পথ ব্লক করে দিয়েছে। এর ফলে আরাকান আর্মি শুধু অর্থ ও নিত্যপণ্যের মারাত্মক সংকটে ভুগছে।

তার মতে, মিয়ানমারের কায়িন স্টেট থেকে চিন স্টেট হয়ে আরাকান আর্মির কাছে এ ধরনের অস্ত্র পৌঁছায়, আর টাকার জন্য বেপরোয়া হয়ে তারা সীমান্ত পার করে অস্ত্র বাংলাদেশের কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে বিক্রি করেছে বলে ধারণা তার।

তদন্তে যা খুঁজছে র‍্যাব

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, আগ্নেয়াস্ত্রটি কীভাবে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এল এবং এর পেছনে কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। অস্ত্রটির উৎস, ব্যাচ নম্বর ও মালিকানা চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “পৃথিবীর সব দেশের সীমান্ত দিয়ে স্মাগলিং হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের সীমান্ত পুরোপুরি চোরাচালানমুক্ত নয়। সীমান্তপথ দিয়ে কোনোভাবে অস্ত্রটি এখানে এসেছে।” একই সুরে সেই সাবেক এএসপিও বলেন, “সীমান্তপথ দিয়েই এটা এসেছে। এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলা যায়।”

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *