ইউনানে ধরপাকড়ে আতঙ্ক, বনাঞ্চলে আশ্রয় নিল শত শত মিয়ানমার অভিবাসী শ্রমিক
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
চীনের ইউনান প্রদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত মিয়ানমারের শত শত অভিবাসী শ্রমিক পুলিশের ধরপাকড় এড়াতে বনাঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্তবর্তী জিংহং শহরে অভিযান জোরদার হওয়ায় অন্তত ৪০০ শ্রমিক আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দালালদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চীনা পুলিশ অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদের আটক করছে। পরে তাদের ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এনডিএএ), যা ‘মংলা গ্রুপ’ নামে পরিচিত, তাদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এনডিএএ আটক শ্রমিকদের মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যেখানে তাদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
একজন পালিয়ে আসা শ্রমিক জানান, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা বার্মিজ, তাআং ও কোকাং দালালদের মাধ্যমে অর্থ দিয়ে জিংহংয়ে ভুট্টার খামার ও বিভিন্ন কারখানায় কাজ করছিলেন। দালালদের চাকরি পাওয়ার জন্য শুরুতে ৪০০ ইউয়ান এবং পরে প্রতি মাসে ৩০০ ইউয়ান করে দিতে হতো। কিন্তু এখন পুলিশ তাদের আটক করে এনডিএএর হাতে তুলে দিচ্ছে। সেখান থেকে তাদের কেনতুংয়ে নিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা শ্রমিকদের বেশিরভাগই ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী। তারা মাগওয়ে, রাখাইন, তাআং ও নাগা অঞ্চল থেকে চীনে গিয়েছেন। প্রত্যেকেই সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ লাখ কিয়াত ব্যয় করেছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জিংহং এলাকায় বর্তমানে ৬ হাজারেরও বেশি মিয়ানমারের শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
একজন শ্রমিক বলেন, “যাকেই পাচ্ছে, তাকেই আটক করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।” তিনি জানান, গ্রেপ্তার হয়ে সরাসরি সেনাবাহিনীতে পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে গেছেন।
আত্মগোপনে থাকা আরেক শ্রমিকের দাবি, গত ১৯ জুলাই পাঁচ শতাধিক মিয়ানমারের শ্রমিককে আটক করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এরপর থেকে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তিনি বলেন, “যে কারখানায় কাজ করতাম সেখানে পুলিশ অভিযান চালানোর পর থেকেই লুকিয়ে আছি। মাস শেষে বেতন নিয়ে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে যে পালিয়ে যেতে হয়েছে। এখন আমরা প্রায় ৩০ জন একসঙ্গে আত্মগোপনে আছি।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মিয়ানমারের শ্রমিকরা সাধারণত রুইলি, জিয়েগাও ও জিংহংয়ের পোশাক কারখানা, কৃষিখামার এবং যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী কারখানায় কাজ করেন। প্রতিবছর এক লাখেরও বেশি শ্রমিক ইউনান প্রদেশে প্রবেশ করেন। তাদের কেউ সীমান্ত পাস নিয়ে বৈধভাবে গেলেও অনেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশ করেন।
অবৈধ শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরেই মজুরি কেটে রাখা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক না পাওয়া এবং নিয়মিত পুলিশি অভিযানের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ধরা পড়লে তাদের দুই থেকে পাঁচ বছরের জন্য চীনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার ইউয়ান জরিমানার মুখে পড়তে হয়। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, আটক শ্রমিকদের সরাসরি এনডিএএর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
তাচিলেকের একজন শ্রমিক অধিকারকর্মীও দাবি করেছেন, চীনা কর্তৃপক্ষ এনডিএএর সমন্বয়ে জিংহংয়ে আটক মিয়ানমারের শ্রমিকদের মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাছে পাঠাচ্ছে।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক অবৈধভাবে রুইলি ও ওয়ানডিংয়ের সীমান্তবর্তী শিল্পাঞ্চলে কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। সেখানে মজুরি দেশের অভ্যন্তরের কারখানার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। তবে এতে একদিকে যেমন মিয়ানমারে দক্ষ শ্রমিকের সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশে গিয়ে শোষণ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন অভিবাসীরা।
সম্প্রতি রুইলির একটি পোশাক কারখানা থেকে ৪৬ জন অবৈধ মিয়ানমার শ্রমিককে আটক করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, দালাল, চীনা পুলিশ এবং সীমান্তের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পড়ে তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারের শ্রম আইন থেকেও তারা কোনো ধরনের সুরক্ষা পাচ্ছেন না।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।