সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোনের মানবিক উদ্যোগে ৩১ জোড়া চোখে নতুন আলোর স্বপ্ন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
চোখে আলো ফিরে পাওয়ার আনন্দ যে কতটা গভীর, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বহুদিনের অন্ধকার, ঝাপসা দৃষ্টি আর অসহায়ত্বের জীবন পেছনে ফেলে যখন আবারও স্পষ্টভাবে পৃথিবীকে দেখতে পারেন একজন মানুষ, তখন সেই অনুভূতি হয়ে ওঠে অনন্য। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা জোনের মানবিক উদ্যোগে এমনই এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো পার্বত্য জনপদ। সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় উন্নত চক্ষু চিকিৎসা ও সফল অস্ত্রোপচার শেষে ৩১ জন পাহাড়ি ও বাঙালি রোগী নতুন আলো নিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে এসেছেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল থেকে যাত্রা করে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে তারা দীঘিনালা জোনে পৌঁছালে সেখানে সৃষ্টি হয় এক আবেগময় পরিবেশ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বজনদের সঙ্গে রোগীদের মিলন, ফিরে পাওয়া দৃষ্টিশক্তির আনন্দ আর সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে হৃদয়স্পর্শী।
জানা গেছে, দুর্গম পার্বত্য এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এসব রোগীকে চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের সফলভাবে চোখের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসা শেষে নিরাপদে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও করে জোন কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘদিন ধরে চোখের নানা জটিলতায় ভোগা এসব রোগীর অনেকের পক্ষেই উন্নত চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব ছিল না। অর্থের অভাবে কেউ বছরের পর বছর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে কষ্টে দিন কাটিয়েছেন, কেউ আবার সংসারের বোঝা হয়ে পড়েছিলেন। সেনাবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগ তাদের জীবনে শুধু চিকিৎসাই এনে দেয়নি, ফিরিয়ে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, কর্মক্ষমতা এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
দীঘিনালা জোনে পৌঁছানোর পর রোগীদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন তাদের স্বজনরা। প্রিয়জনদের চোখে আবারও আলো ফিরে এসেছে—এই আনন্দে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছেন, কেউ স্বামী বা স্ত্রীকে দেখে অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। অনেক পরিবারের জন্য এটি ছিল বহুদিনের প্রতীক্ষিত একটি সুখের মুহূর্ত।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া রোগীরা সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, “আমরা অনেকেই টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় আজ আবার স্পষ্টভাবে পৃথিবী দেখতে পারছি। এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়।”
আরেকজন রোগী বলেন, “এই উদ্যোগ না থাকলে হয়তো সারাজীবন অন্ধকারেই কাটাতে হতো। এখন আবার নিজের কাজ করতে পারব, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারব।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, দুর্গম পার্বত্য এলাকায় যেখানে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন, সেখানে দীঘিনালা জোন নিয়মিতভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করছে।
দীঘিনালা জোন সূত্র জানায়, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতেও অসহায় ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে যেসব মানুষ আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন, তাদের পাশে দাঁড়াতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কাছে এই উদ্যোগ শুধু একটি চিকিৎসা কার্যক্রম নয়, বরং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ৩১ জন মানুষের চোখে নতুন আলো ফিরিয়ে দিয়ে দীঘিনালা জোন আবারও প্রমাণ করেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নীরবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।