ছয় বছর পরও মেজর সিনহা হত্যার বিচার ঝুলছে আপিলে

ছয় বছর পরও মেজর সিনহা হত্যার বিচার ঝুলছে আপিলে

ছয় বছর পরও মেজর সিনহা হত্যার বিচার ঝুলছে আপিলে
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় দুই আদালতেই আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল। তার পরও ছয় বছর পার করা মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির করা লিভ টু আপিল আবেদন এখনো শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হয়নি।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। অভিযোগ অনুযায়ী, বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী গুলি চালান।

ঘটনার পাঁচ দিন পর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে আদালতে হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর র‍্যাব আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। সেখানে হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করা হয় এবং ১৫ জনকে আসামি করা হয়।

২০২১ সালের ২৭ জুন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ১৫ আসামির বিচার শুরুর আদেশ দেয়। প্রায় সাত মাস বিচার শেষে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল রায় দেন। রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতসহ আরো ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অপর কয়েকজন আসামি খালাস পান।

হাইকোর্টে দীর্ঘ অপেক্ষার পর শুনানি

নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দণ্ডিত আসামিরাও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল করার সুযোগ পান। ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছায় এবং কারাগারে থাকা দণ্ডপ্রাপ্তরা পৃথকভাবে আপিল করেন।

অন্যদিকে খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের সাজা বাড়ানোর দাবিতে বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসও ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন।

এ পর্যায়ে পেপারবুক প্রস্তুতসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত কারণে মামলাটি দীর্ঘদিন শুনানির অপেক্ষায় থাকে। শুনানি দীর্ঘদিন আটকে থাকার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নির্দেশে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত হয়। পরে বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানির জন্য নথি পাঠানো হয়।

২৩ এপ্রিল শুনানি শুরু হয়ে ২৯ মে শেষ হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২ জুন হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা বহাল থাকে।

হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান শুনানিতে নেতৃত্ব দেন। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জসিম সরকার, মো. আসাদ উদ্দিনসহ অন্যান্য আইন কর্মকর্তা।

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ফলে আসামিরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার জন্য ৩০ দিন সময় পান। প্রদীপের আইনজীবী মোহাম্মদ মুনসুরুল হক চৌধুরী সেই সময় জানিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর তার মক্কেল হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে যাবেন।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরও অপেক্ষা

রায় ঘোষণার প্রায় ছয় মাস পর হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর। এরপর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রদীপ কুমার দাশের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী তখন জানিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর তারা আপিল বিভাগে যাবেন। অন্যদিকে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ছয় আসামি ইতোমধ্যে লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করেছেন।

তবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুর দিক পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব আবেদন শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে। অর্থাৎ নিম্নআদালত ও হাইকোর্ট— দুই ধাপেই মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের রায় বহাল থাকলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলাটি এখনো চূড়ান্ত মীমাংসার মুখ দেখেনি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রদীপ ও লিয়াকতের ক্ষেত্রে তাদের আইনজীবী আপিল বিভাগে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও, সেই আপিল বা লিভ টু আপিল আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যতালিকায় ওঠা এবং তার শুনানি শুরু হওয়া এখনো বাকি।

মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ার সময়রেখা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি ধাপেই দীর্ঘ বিরতি রয়েছে। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করেন। এর আটদিন পর, ৮ ফেব্রুয়ারি ডেথ রেফারেন্স ও সংশ্লিষ্ট নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। তবে এরপর মামলাটি শুনানির জন্য অপেক্ষায় থাকে টানা তিন বছরেরও বেশি সময়। অবশেষে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয় এবং একই বছরের ২ জুন রায় ঘোষণা করা হয়। পরে ২০ নভেম্বর হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগের পর্যায়ে রয়েছে। লিভ টু আপিল দাখিল হলেও ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত শুনানির জন্য কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি। ফলে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরও আট মাসের বেশি সময় ধরে আপিল বিভাগের শুনানি শুরু হয়নি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

রাষ্ট্রপক্ষ শুরু থেকেই নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট—উভয় স্তরের রায় বহাল রাখার পক্ষে সওয়াল করেছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ, বিশেষত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রদীপ কুমার দাশের আইনজীবী, হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ছয় আসামিও ইতিমধ্যে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দাখিল করেছেন। এছাড়া মামলার বাদী তথা সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের পক্ষ থেকে খালাসপ্রাপ্তদের সাজা ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের সাজা বাড়ানোর দাবিতে করা ফৌজদারি রিভিশন আবেদনও এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।

বাদীর প্রত্যাশা

মামলার বাদী ও মেজর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস গত শনিবার বিকেলে আমার দেশকে বলেন, নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে রায় হলেও বিচার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আপিল বিভাগের রায় এবং তা কার্যকর হওয়ার পরই প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুত আপিলের শুনানি শেষ করে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হবে। এত বছর পরও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় আমরা এখনো অপেক্ষায় আছি।

-আমার দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *