ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট ও বাংলাদেশ: মিয়ানমারের ওপর চাপকে কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তর
![]()
ড. সরদার আলী হায়দার
কয়েকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মিয়ানমার নীতি এবং ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে পড়ছিলাম। প্রথমে মনে হয়েছিল, এটি হয়তো মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি নিষেধাজ্ঞার আইন। পরে একটু গভীরে গিয়ে দেখি, বিষয়টি শুধু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশেরও সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
মিয়ানমারে যুদ্ধ চলছে বহু বছর ধরে। প্রতিদিন মানুষ মরছে। গ্রাম পুড়ছে। মানুষ ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। কোথাও সামরিক বাহিনী হামলা করছে, কোথাও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এলাকা দখল করছে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণও সব জায়গায় নেই।
এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের ওপর। তবে পাশের দেশ হিসেবে বাংলাদেশও কম ভুগছে না। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের দেশে অবস্থান করছে। কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের জীবন বদলে গেছে। বন গেছে। জমির দাম বেড়েছে। শ্রমবাজারে চাপ পড়েছে। মাদক, মানবপাচার, অস্ত্র এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতাও বেড়েছে।
এদিকে প্রত্যাবাসনের কথা বহুবার হয়েছে। বৈঠক হয়েছে। তালিকা হয়েছে। প্রতিনিধি গেছে। ছবি উঠেছে। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও নিরাপদ ও স্থায়ীভাবে ফেরত যায়নি।
এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর পুরো নাম Bringing Real Accountability Via Enforcement in Burma Act। সংক্ষেপে BRAVE Burma Act। নামটা শুনতে বেশ শক্তিশালী। মনে হয়, মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবার খুব বড় কিছু করতে যাচ্ছে। কিন্তু আইনটি পড়লে বোঝা যায়, এর ক্ষমতা যেমন আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে।
বিলটি ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপন করা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদ এটি পাস করে। পরে সিনেটে পাঠানো হয়েছে। এখনো এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি। অর্থাৎ বিষয়টি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং বাংলাদেশের জন্য কাজ করার সময় এখনই।
বিলটির মূল লক্ষ্য হলো মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং জেট ফুয়েল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো। আইনটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে প্রতি বছর পর্যালোচনা করতে হবে, মিয়ানমারের নির্দিষ্ট ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশি কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার মতো কাজ করছে কি না।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট পাস হলেই সব প্রতিষ্ঠান সঙ্গে সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না। বরং প্রতি বছর তাদের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হবে। কারা সামরিক সরকারকে অর্থ দিচ্ছে, কারা জেট ফুয়েল সরবরাহ করছে, কারা পণ্য পরিবহন করছে, কারা ব্যাংকিং সুবিধা দিচ্ছে—এসব দেখা হবে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, শুধু পরীক্ষা করে কী লাভ? আসলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভয় অনেক সময় নিষেধাজ্ঞার আগেই কাজ করে।
একটি ব্যাংক যদি মনে করে, মিয়ানমারের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করলে ভবিষ্যতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়তে পারে, তখন তারা আগেই দূরে সরে যায়। একটি শিপিং কোম্পানি জাহাজ দিতে চায় না। একটি বিমা কোম্পানি ঝুঁকি নিতে চায় না। একটি জ্বালানি সরবরাহকারী চুক্তি বাতিল করে। কাগজে নিষেধাজ্ঞা হয়নি, কিন্তু ব্যবসা থেমে যায়। এই জায়গাতেই ব্রেভ বার্মা অ্যাক্টের আসল শক্তি।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এখন স্থলযুদ্ধে অনেক জায়গায় চাপে আছে। তারা বহু এলাকা হারিয়েছে। অনেক সড়ক নিরাপদ নয়। বহু সামরিক ঘাঁটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই কারণে সামরিক বিমান ও হেলিকপ্টারের ওপর তাদের নির্ভরতা বেড়েছে। যেখানে সেনারা যেতে পারে না, সেখানে বিমান যায়। যেখানে প্রতিরোধ শক্তিশালী, সেখানে আকাশ থেকে হামলা হয়। ফলে জেট ফুয়েলের ওপর চাপ বাড়ানো মানে শুধু একটি পণ্য আটকে দেওয়া নয়। এটি সামরিক অভিযানের সক্ষমতাকে ব্যয়বহুল ও কঠিন করে তোলা।
তবে এখানেও বাস্তবতা আছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকার বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। তারা বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী ব্যবহার করে। অন্য দেশের কোম্পানি ব্যবহার করে। কাগজে এক নামে, কাজে অন্য নামে ব্যবসা চালায়। অনেক সময় জ্বালানি এক দেশের বন্দরে আসে, অন্য দেশের কোম্পানির মাধ্যমে কেনা হয়, তারপর তৃতীয় পথে মিয়ানমারে যায়। কে বিক্রি করেছে, কে টাকা দিয়েছে, কে আসল মালিক—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আইন দিয়ে সব বন্ধ হবে না। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র সহযোগিতা না করলে নিষেধাজ্ঞার অনেক পথ খোলা থাকবে।
আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক। সামরিক সরকার শুধু অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না। টাকারও প্রয়োজন হয়। বৈদেশিক মুদ্রা লাগে। তেল, গ্যাস, খনিজ, ব্যাংকিং, আমদানি ও রপ্তানি—সবকিছুর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জড়িত।
মিয়ানমার ইকোনমিক ব্যাংক এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সামরিক সরকারের আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়লে আন্তর্জাতিক লেনদেন কঠিন হতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞার আরেকটি দিকও আছে। ব্যাংক যখন বেশি ভয় পায়, তখন তারা শুধু সামরিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বন্ধ করে না। অনেক সময় মানবিক সংস্থার টাকাও আটকে যায়। সাধারণ ব্যবসায়ী পণ্য আমদানি করতে পারে না। হাসপাতালের জন্য ওষুধ কেনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আইন সামরিক সরকারকে লক্ষ্য করে, কিন্তু কষ্ট পায় সাধারণ মানুষ। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা সবসময় খুব নিখুঁত অস্ত্র নয়।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার দুর্বল হতে পারে, আবার সাধারণ মানুষের দুঃখও বাড়তে পারে। আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য বন্ধ হলে কালোবাজার বাড়ে। বৈধ ব্যাংকিং বন্ধ হলে হুন্ডি ও অপরাধী চক্র শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্র দুর্বল হলে সীমান্তে অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের পথ আরও খুলে যায়।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় চিন্তা। আমরা চাই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর চাপ বাড়ুক। কিন্তু সেই চাপের কারণে যদি আবার কয়েক লাখ মানুষ বাংলাদেশে চলে আসে, তাহলে লাভ কার হবে?
যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেবে। ইউরোপ বিবৃতি দেবে। জাতিসংঘ সভা করবে। কিন্তু নতুন শরণার্থীরা প্রথমে আসবে বাংলাদেশের সীমান্তে। তাই বাংলাদেশের শুধু হাততালি দেওয়ার সুযোগ নেই। আগে থেকেই বলতে হবে, মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ালে তার আঞ্চলিক ও মানবিক পরিণতির দায়িত্বও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিতে হবে।
ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম দাবি হওয়া উচিত—রোহিঙ্গা সংকটকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। শুধু ব্যাংক, জ্বালানি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কথা বললে হবে না। রাখাইন রাজ্যের বাস্তবতা নিয়েও কথা বলতে হবে।
রোহিঙ্গারা কেন ফিরতে পারছে না?
তাদের বাড়িঘর নেই। নাগরিকত্ব নেই। চলাচলের স্বাধীনতা নেই। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। অনেক জায়গায় এখনও শিবিরের মতো পরিবেশ। ফিরে গেলে আবারও নিপীড়নের শিকার হবে কি না, সেই ভয় আছে। এই অবস্থায় প্রত্যাবাসনের তালিকা বানিয়ে কোনো লাভ নেই। মানুষ শুধু ট্রাক বা নৌকায় করে ফেরে না। মানুষ তখনই ফেরে, যখন তার মনে হয় সেখানে জীবন আছে। নিরাপত্তা আছে। সন্তানকে স্কুলে পাঠানো যাবে। হাসপাতালে যাওয়া যাবে। জমি ও ঘরের অধিকার থাকবে।
বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বলতে হবে, ভবিষ্যতে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অধিকার যুক্ত করতে হবে। চলাচলের স্বাধীনতা দিতে হবে। আইনি পরিচয় দিতে হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। নিরাপদ অঞ্চলের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু সামরিক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হলেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় কাজ হওয়া উচিত ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নিয়মিত পরামর্শ ব্যবস্থা তৈরি করা।
আমরা প্রায়ই দেখি, বড় দেশগুলো মিয়ানমার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে খুব গভীরভাবে আলোচনা করে না। যেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আছে, কিন্তু নীতি তৈরি হবে অন্য কোথাও। এই অবস্থা বদলাতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, নিরাপত্তা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ট্রেজারির সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আলোচনা হতে পারে—কারা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলছে, কোন কোম্পানি ছদ্ম নামে ব্যবসা করছে, কোথা দিয়ে জেট ফুয়েল যাচ্ছে, কোন ব্যাংক অর্থ স্থানান্তর করছে, কোন পথে অস্ত্র ও মাদক আসছে। এই তথ্য বাংলাদেশের কাছেই বেশি আছে।
সীমান্তে কী হচ্ছে, টেকনাফে কী আসছে, কোন পথে ইয়াবা ঢুকছে, মানবপাচারকারীরা কীভাবে কাজ করছে—এসব ওয়াশিংটনের গবেষণা রিপোর্টে পুরোপুরি বোঝা যায় না। বাংলাদেশ চাইলে এই জ্ঞানকে কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে। তবে সতর্ক থাকতে হবে।বাংলাদেশ যেন কোনো দেশের হয়ে মিয়ানমারে সরকার পরিবর্তনের খেলায় না নামে। আমাদের স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। আবার চীনের সঙ্গেও পুরোপুরি এক নয়। ভারতের সঙ্গেও নয়।
আমাদের স্বার্থ আমাদেরই। বাংলাদেশ চাইবে সীমান্ত স্থিতিশীল থাকুক। রোহিঙ্গারা নিরাপদে ফিরে যাক। মাদক ও অস্ত্র বন্ধ হোক। রাখাইনে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হোক, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি হয়। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশের তৃতীয় দাবি হওয়া উচিত মানবিক বোঝা ভাগাভাগি। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রতি বছর কমছে। খাদ্য সহায়তা কমে যায়। শিক্ষা প্রকল্প বন্ধ হয়। স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হয়। পরে আবার বলা হয়, ক্যাম্পে অপরাধ বেড়েছে। একদিকে মানুষকে কাজ করতে দেওয়া হয় না। অন্যদিকে খাবারও কমিয়ে দেওয়া হয়। তারপর তাদের হতাশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এইভাবে কোনো সংকট দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না।
বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বলতে হবে, মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ালে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের জন্য বহু বছরের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষও সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে। তারা বছরের পর বছর এই সংকটের চাপ সহ্য করছে। তাদের রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল, পানি, বন ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ পড়েছে। শুধু শরণার্থী শিবিরে টাকা দিলে হবে না। আশপাশের বাংলাদেশি জনগণকে বাদ দিলে ক্ষোভ বাড়বে।
ঝুঁকিপূর্ণ কিছু রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও বাড়ানো দরকার। সবাইকে পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পরিবার নতুন জীবন পেতে পারে। এতে অন্তত বোঝা যাবে, পৃথিবীর এই সংকটে শুধু বাংলাদেশ একা নয়।
আরেকটি কাজ এখন থেকেই করা দরকার। বাংলাদেশি ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে। মিয়ানমারের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করলে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি আছে কি না, তা অনেক ব্যবসায়ী জানেন না। ব্যাংক কর্মকর্তারাও অনেক সময় পরিষ্কার নির্দেশনা পান না। ফলে দুই ধরনের সমস্যা হয়। একদল ঝুঁকি বুঝতে না পেরে নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করে। আরেক দল অতিরিক্ত ভয় পেয়ে সব ধরনের বৈধ লেনদেন বন্ধ করে দেয়। দুটোই ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিষ্কার নির্দেশনা দিতে হবে। প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে হবে। ছদ্ম প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে মানবিক ও বৈধ বাণিজ্যের পথও খোলা রাখতে হবে।
সবশেষে বড় প্রশ্ন আসে—বাংলাদেশ কার সঙ্গে যাবে? যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, না চীনের সঙ্গে? আমার মনে হয়, প্রশ্নটাই ভুল। বাংলাদেশকে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে গিয়ে অন্য পক্ষকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, জবাবদিহি ও মানবিক সহায়তার বিষয়ে কাজ করা যায়। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে কথা বলা যায়। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা করা যায়। ASEAN-এর সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা যায়।
রাষ্ট্রের স্বার্থ এক দরজা দিয়ে আসে না। বড় শক্তিরা নিজেদের স্বার্থ দেখে। বাংলাদেশকেও নিজের স্বার্থ দেখতে হবে। ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে সঙ্গে সঙ্গে বদলে দেবে না। যুদ্ধও বন্ধ হবে না। রোহিঙ্গারাও আগামীকাল ফিরে যাবে না। কিন্তু এই আইন একটি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। আর চাপ কখনো কখনো দরকষাকষির সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের কাজ হলো সেই সুযোগকে কাজে লাগানো।
শুধু বলা নয়, “আমরা আইনটিকে স্বাগত জানাই।” বলতে হবে—এই আইনের ফলে যদি মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ে, তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ কোথায়? বাংলাদেশের জন্য অর্থায়ন কোথায়? নতুন শরণার্থী ঢল ঠেকানোর পরিকল্পনা কোথায়? রাখাইনে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায়?
অন্যের চাপকে নিজের কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তর করতে হলে আগে নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার থাকতে হয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনটি-
- রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন।
- সীমান্তের স্থিতিশীলতা।
- এবং মিয়ানমার সংকটের বোঝা আন্তর্জাতিকভাবে ভাগাভাগি করা।
এই তিনটি বিষয় সামনে রেখে বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করে, তাহলে ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিষেধাজ্ঞা আইন হয়ে থাকবে না। এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে।
সময় চলে গেলে আইন পাস হবে। নীতি তৈরি হবে। কমিটি বসবে। রিপোর্ট লেখা হবে। তারপর বাংলাদেশকে আবার বলা হবে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধৈর্য ধরতে। আমরা অনেক বছর ধৈর্য ধরেছি। এবার প্রয়োজন, ধৈর্যের সঙ্গে কৌশলও।
তথ্যসূত্র:
Congressional Budget Office. (2025). H.R. 3190, Bringing Real Accountability Via Enforcement in Burma Act. Washington, DC: Congressional Budget Office.
Office of Foreign Assets Control. (2023a). Frequently Asked Question 1132: Sanctions Risk in the Jet-Fuel Sector of the Burmese Economy. Washington, DC: United States Department of the Treasury.
Office of Foreign Assets Control. (2023b). Frequently Asked Question 1133: Interpretation of the Jet-Fuel Sector of the Burmese Economy. Washington, DC: United States Department of the Treasury.
Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights. (2026). Annual Update on the Human Rights Situation in Myanmar in 2025. Bangkok: OHCHR Regional Office for South-East Asia.
United Nations High Commissioner for Refugees. (2026a). UN and Partners Appeal for USD 710.5 Million to Meet the Critical Needs of Rohingya Refugees and Bangladeshi Host Communities. Dhaka and Geneva: UNHCR.
United Nations High Commissioner for Refugees. (2026b). UNHCR and Humanitarian Partners Ask the World Not to Forget Rohingya Refugees in Bangladesh. Geneva: UNHCR.
United States Congress. (2022). Burma Unified through Rigorous Military Accountability Act of 2022. Enacted as part of the James M. Inhofe National Defense Authorization Act for Fiscal Year 2023, Public Law 117–263. Washington, DC: United States Government Publishing Office.
United States Congress. (2026). Bringing Real Accountability Via Enforcement in Burma Act, H.R. 3190, 119th Congress: House-Passed Text Referred to the Senate. Washington, DC: United States Government Publishing Office.
United States Department of the Treasury. (2023). Directive 1 under Executive Order 14014: Prohibitions Related to Financial Services to or for the Benefit of Myanma Oil and Gas Enterprise. Washington, DC: United States Department of the Treasury.
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।