রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান, রোহিঙ্গা অধিকার ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান, রোহিঙ্গা অধিকার ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান, রোহিঙ্গা অধিকার ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

ড. সরদার এ. হায়দার

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে একটি নীরব কিন্তু ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কয়েক বছর আগেও রাখাইন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া, তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং প্রত্যাবাসন, এসব প্রশ্নই স্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল।

কিন্তু একই সময় রাখাইনের ভেতরে আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। ২০০৯ সালে খুব ছোট একটি সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করা আরাকান আর্মি বা এএ (AA) আজ রাখাইনের অধিকাংশ অঞ্চলের প্রধান সামরিক শক্তি। এর রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান বা ইউএলএ (ULA) শুধু যুদ্ধ করছে না; তারা বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসন, কর আদায়, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বিধিবিধান পরিচালনার চেষ্টা করছে।

ফলে আমাদের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন এসেছে, রাখাইন আসলে কে শাসন করছে?

এই প্রশ্নটির উত্তর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোহিঙ্গারা যে ভূখণ্ডে ফিরে যাবে, সেখানে যদি মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে অন্য কোনো শক্তি কার্যকর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, তাহলে কেবল নেপিদোর সঙ্গে চুক্তি করে প্রত্যাবাসনের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

ছোট বিদ্রোহী সংগঠন থেকে বড় সামরিক শক্তি

আরাকান আর্মি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের এপ্রিলে। এর নেতা তুয়ান ম্রাত নাইং এবং তাঁর কয়েকজন সহযোগী প্রথমদিকে মিয়ানমারের উত্তরে কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির সহায়তায় প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেন। তখন খুব কম মানুষই হয়তো ধারণা করেছিলেন যে একদিন এই সংগঠন রাখাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

কিন্তু তাদের উত্থান হঠাৎ হয়নি।

আরাকান আর্মি দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠন, নেতৃত্ব, সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে তুলেছে। তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে রাখাইন জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি, ঐতিহাসিক আরাকানের স্মৃতি এবং তথাকথিত ‘Way of Rakhita’ বা রাখিতা পথ। ম্রাউক-উ রাজ্যের ইতিহাসকেও তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আরাকান আর্মি প্রথমে শুধু এলাকা দখল করে পরে প্রশাসন গড়েনি। বরং সামরিকভাবে পুরোপুরি শক্তিশালী হওয়ার আগেই তারা স্থানীয় প্রশাসন, কর সংগ্রহ, বিচার এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। এই বিষয়টিই তাদের অন্য অনেক সশস্ত্র সংগঠন থেকে আলাদা করেছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর যখন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন আরাকান আর্মি সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে সক্ষম হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার পর তাদের সামরিক অগ্রগতি দ্রুত হয়। ২০২৬ সালের মধ্যে রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিতে ইউএলএ/এএ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে প্রধানত রয়ে গেছে সিত্তে, কিয়াউকফিউ ও মানাউং। একই সঙ্গে দক্ষিণ চিন রাজ্যের পালেতওয়াও আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি শুধুই একটি সামরিক মানচিত্রের পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে রাখাইনের রাজনৈতিক মানচিত্রও।

রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান, রোহিঙ্গা অধিকার ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

জমির নিয়ন্ত্রণ মানেই পূর্ণ বিজয় নয়

তবে আরাকান আর্মি অধিকাংশ স্থলভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে অকার্যকর হয়ে গেছে-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল হবে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এখনও আকাশ ও সমুদ্র থেকে বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম। Bellingcat-এর ACLED তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিমান ও ড্রোন হামলার নথিভুক্ত ঘটনা ২০২৩ সালে ৩০টি থেকে ২০২৪ সালে ৪৬১টিতে বেড়েছিল। অর্থাৎ স্থলভাগে সেনাবাহিনী যত দুর্বল হয়েছে, তত বেশি তারা আকাশশক্তির ওপর নির্ভর করেছে। এখানেই রাখাইনের বর্তমান সামরিক বাস্তবতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। স্থলে আরাকান আর্মির প্রাধান্য, কিন্তু আকাশ ও সমুদ্রে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা। এই ভারসাম্য ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণ হতে পারে।

সিত্তে ও কিয়াউকফিউ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

রাখাইনের রাজধানী সিত্তে শুধু একটি শহর নয়। এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীক। প্রত্যন্ত কোনো সামরিক ঘাঁটি হারানো এবং একটি রাজ্যের রাজধানী হারানো রাজনৈতিকভাবে এক বিষয় নয়। আরাকান আর্মি যদি একসময় সিত্তে দখল করতে সক্ষম হয়, তাহলে তারা দেখাতে পারবে যে শুধু গ্রাম ও সীমান্ত এলাকা নয়, রাখাইনের প্রশাসনিক কেন্দ্রও তারা পরিচালনা করতে সক্ষম। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপরও। কারণ প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ যদি শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে, অথচ যে এলাকায় রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে সেই এলাকা যদি অন্য কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে কাগজে থাকা চুক্তি বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান কিয়াউকফিউ। এখান থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন রয়েছে। এখানেই পরিকল্পিত গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ফলে কিয়াউকফিউ শুধু রাখাইনের যুদ্ধের অংশ নয়; এটি চীনের ভারত মহাসাগরীয় কৌশলের সঙ্গেও যুক্ত। এখানে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে, কিন্তু প্রকল্পের বাস্তব নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে যে শক্তি ওই ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে তার ওপর। অর্থাৎ আইনি কর্তৃত্ব এক জায়গায়, কার্যকর কর্তৃত্ব আরেক জায়গায়। এটিই আজকের রাখাইনের রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।

আরাকান আর্মি কি এখন সরকার?

এ প্রশ্নের উত্তর একই সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’।

আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএলএ/এএ কোনো স্বীকৃত সরকার নয়। রাখাইন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এখনও মিয়ানমারের অংশ। কিন্তু বাস্তবে ইউএলএ/এএ অনেক সরকারি কাজ করছে। তারা কর আদায় করছে, স্থানীয় আদালত পরিচালনা করছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালাচ্ছে, চলাচল ও ব্যবসার ওপর নিয়ম তৈরি করছে এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তার করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বড় সামরিক বিজয়ের আগেই রাখাইনের অনেক এলাকায় মানুষ মিয়ানমারের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ইউএলএ/এএ-দুই ধরনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিল।

তাই আরাকান আর্মিকে এখন শুধু ‘বিদ্রোহী সংগঠন’ বলা বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। তাদেরকে বরং বলা যেতে পারে একটি উদীয়মান কার্যকর আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ, যারা রাষ্ট্রের মতো কিছু কাজ করছে, কিন্তু এখনও রাষ্ট্র নয়। কারণ তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। তারা আকাশ ও সমুদ্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। স্থায়ী অর্থব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতি কিংবা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য নাগরিকত্বব্যবস্থাও এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখানেই সামরিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বৈধতার পার্থক্য।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আচরণ

আরাকান আর্মির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন সম্ভবত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ নয়। সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হতে পারে, তারা রোহিঙ্গাদের কীভাবে দেখবে এবং কীভাবে শাসন করবে?

রোহিঙ্গারা রাখাইনের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বাইরে থাকা কোনো জনগোষ্ঠী নয়। তাদের ঐতিহাসিক বসবাস উত্তর রাখাইনে। বর্তমানে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। ফলে রাখাইনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে যেকোনো আলোচনায় নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, জমির অধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন সামনে আসবেই।

কিন্তু সাম্প্রতিক মানবাধিকার প্রতিবেদন উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২৬ সালের আগস্টে জানিয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, জোরপূর্বক নিয়োগ, আটক এবং বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে।

Human Rights Watch-এর Hoyyar Siri হত্যাকাণ্ডবিষয়ক অনুসন্ধান আরও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তাদের তদন্তে সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ছবি, ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ২০২৪ সালের মে মাসে বহু রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষের হত্যার জন্য আরাকান আর্মির সদস্যদের দায়ী করার মতো প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। ইউএলএ/এএ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই বিতর্ককে সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। যুদ্ধক্ষেত্রে সব পক্ষই তথ্যযুদ্ধ চালায়। তাই যাচাই ছাড়া কোনো দাবি গ্রহণ করা উচিত নয়। কিন্তু স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থার অনুসন্ধানকেও উপেক্ষা করা যায় না।

এখানেই আরাকান আর্মির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মূল পরীক্ষা। একটি জাতিগোষ্ঠী যদি নিজের স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করে, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে অন্য একটি জনগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করে, তাহলে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা অর্জন করতে পারবে না।

রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আরেকটি বিপজ্জনক চক্র

সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে ARSA, Rohingya Solidarity Organisation এবং অন্যান্য রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী। এখানে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হওয়া দরকার, রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন এবং সাধারণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এক নয়। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা হলে একটি ভয়াবহ চক্র তৈরি হতে পারে।

সশস্ত্র হামলা থেকে নিরাপত্তা অভিযান, সেখান থেকে সাধারণ মানুষের ওপর সন্দেহ ও বিধিনিষেধ, এরপর নতুন ক্ষোভ; আর সেই ক্ষোভ থেকে আবার সশস্ত্র সংগঠনের জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহের সুযোগ। এই চক্র ভাঙতে না পারলে রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন

বাংলাদেশ এতদিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে প্রধানত দুই রাষ্ট্রের সমস্যা হিসেবে দেখেছে। বাংলাদেশ আলোচনা করবে মিয়ানমারের সঙ্গে; মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের যাচাই করবে; এরপর নিরাপদ প্রত্যাবাসন হবে। কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেক জটিল।

মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং নাগরিকত্ব দেওয়ার আইনি ক্ষমতাও মূলত তার হাতে। কিন্তু উত্তর রাখাইনের বড় অংশ এবং বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন এলাকার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন ইউএলএ/এএর হাতে। অন্যদিকে ইউএলএ/এএ সেখানে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু তারা এককভাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে পারে না।

ফলে আমাদের পুরোনো প্রশ্ন- ‘রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে?’এখন আর যথেষ্ট নয়।

নতুন প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘তারা কার শাসনের অধীনে ফিরবে, কী আইনি মর্যাদা নিয়ে ফিরবে এবং তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার কে নিশ্চিত করবে?’ এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরাকান আর্মির সঙ্গে কথা বলা কি স্বীকৃতি দেওয়া? এখানেও বাংলাদেশকে বাস্তববাদী হতে হবে।

২০২৬ সালের আগস্টে আরাকান আর্মির কাছ থেকে ২৪ জন বাংলাদেশি জেলেকে নাফ নদীর জিরো লাইনে গ্রহণ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। ঘটনাটি সংখ্যায় ছোট হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব বড়। এটি দেখিয়েছে, যোগাযোগ মানেই স্বীকৃতি নয়।

সীমান্তের অপর পাশে যে শক্তি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করছে, তার সঙ্গে জেলে ফেরত আনা, সীমান্ত ঘটনা, মানবপাচার, মাদক, অনুপ্রবেশ বা স্থানীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যেতে পারে। তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ তাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই দ্বিমুখী নীতি প্রয়োজন।

একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে। কারণ নাগরিকত্ব, জাতীয়তা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রশ্নে মিয়ানমার রাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে সীমান্তের বাস্তবতা মোকাবিলায় ইউএলএ/এএর সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত ও প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগের পথও খোলা রাখতে হবে।

ভারত ও চীনও একই বাস্তবতার মুখোমুখি

এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়। ভারতের কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পালেতওয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, যা এখন ইউএলএ/এএর নিয়ন্ত্রণে। ফলে শুধু নেপিদোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের জন্য কঠিন হতে পারে।

চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল-গ্যাস পাইপলাইন ও China–Myanmar Economic Corridor-এর ভবিষ্যৎও রাখাইনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাংলাদেশ, ভারত ও চীন তিন দেশকেই এক ধরনের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে: যে সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেই সরকার সবসময় ভূমির কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নেই।

বাংলাদেশ এখন কী করতে পারে?

প্রথমত, মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনীতি অব্যাহত রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সীমান্তে কার্যকর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগ রাখতে হবে,কিন্তু সেটি হতে হবে সুসংগঠিত, নীতিনির্ভর এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তৃতীয়ত, আরাকান আর্মির সঙ্গে যেকোনো যোগাযোগে রোহিঙ্গা অধিকারকে কেন্দ্রীয় বিষয় করতে হবে। শুধু সীমান্ত শান্ত রাখা কিংবা জেলে ফেরত আনার বিষয় নয়; নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, জমির অধিকার, জীবিকা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নও তুলতে হবে।

চতুর্থত, বাংলাদেশের নিজস্ব রাখাইন-বিষয়ক বিশেষায়িত বিশ্লেষণী সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাখাইনের যুদ্ধক্ষেত্র, ইউএলএ প্রশাসন, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী, চীন ও ভারতের কার্যক্রম, সীমান্ত বাণিজ্য এবং অবৈধ অর্থনীতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষায়িত কাঠামো প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশকে শুধু ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নীতি’ নিয়ে ভাবলে হবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি বৃহত্তর ‘রাখাইন রাজনৈতিক বাস্তবতা নীতি’। কারণ মানুষকে শুধু নাফ নদীর ওপারে পাঠিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন সফল হয় না। তাদের প্রয়োজন নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বাড়িঘর ও জমির অধিকার, জীবিকা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

শেষ কথা

রাখাইন এখন সম্ভবত তার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আরাকান আর্মি প্রমাণ করেছে যে তারা যুদ্ধ করতে এবং ভূখণ্ড দখল করতে পারে। ইউএলএর মাধ্যমে তারা এটিও দেখানোর চেষ্টা করছে যে তারা প্রশাসন পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ জয় করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এক বিষয় নয়।

ভূখণ্ড দখল ক্ষমতা দেয়; প্রশাসন কর্তৃত্ব তৈরি করে। কিন্তু ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তি ও জবাবদিহিই রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করে। এই জায়গাতেই আরাকান আর্মির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সামনে।

রাখাইনের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু সিত্তে বা কিয়াউকফিউয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হবে না। আরও গভীর একটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর তা নির্ভর করবে:

নতুন আরাকান রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি এমন একটি রাখাইন গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে রাখাইন, রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠী সবাই নিরাপত্তা, অধিকার এবং রাজনৈতিক মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে? বাংলাদেশের জন্যও প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর উত্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কৌশলগত ভারসাম্য।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *