আলীকদমে সেনাবাহিনীর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রো ভাষা শিক্ষা ক্লাবের উদ্বোধন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে বান্দরবানের আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রো ভাষা শিক্ষা ক্লাব-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল ১১টায় সেনাবাহিনীর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়ন কমান্ডারের দিকনির্দেশনায় এবং আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের উদ্যোগে এ ব্যতিক্রমী শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মেজর খন্দকার মোশতাক আহমেদ।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান আশিক। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাংবাদিক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান আশিক বলেন, ‘একটি ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বাস্তবতায় মাতৃভাষা শিক্ষা ক্লাব প্রতিষ্ঠা ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজস্ব শিকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।’

তিনি আরও বলেন, আলীকদমের রেংমিটচ্য ভাষা, যা বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়, সেই ভাষায় এখন মাত্র সাতজন মানুষ কথা বলতে পারেন। এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ২০২৪ সালে ক্রাংসিপাড়া সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিশুদের রেংমিটচ্য ভাষা শেখানো ও চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
আয়োজকরা জানান, ভাষা শিক্ষা ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একদিন নিয়মিতভাবে মারমা, ত্রিপুরা ও ম্রো ভাষার বর্ণমালা, শব্দভাণ্ডার, উচ্চারণ, মৌলিক ব্যাকরণ, লোকজ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে পাঠদান করা হবে। পাশাপাশি ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হবে।
বক্তারা বলেন, মাতৃভাষা সংরক্ষণে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং বহুত্ববাদী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণেও এটি কার্যকর অবদান রাখবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ভাষা শিক্ষা ক্লাব চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক মাতৃভাষা শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান অতিথি।
স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন মহল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী, দূরদর্শী ও প্রশংসনীয় বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-ঐতিহ্য সংরক্ষণে সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগ পার্বত্য অঞ্চলে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে স্থানীয়রা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।