মণিপুরে ছয় মাসে ১,৪২২ অস্ত্র ও ৭ হাজারের বেশি গুলি উদ্ধার
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
ভারতের সহিংসতাকবলিত মণিপুরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে ১ হাজার ৪২২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭ হাজার ১০টি গুলি ও ১ হাজার ১৩৭টি বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো। রাজ্যে নিরাপত্তা অভিযান জোরদারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) ইম্ফলের ১ম মণিপুর রাইফেলসের প্যারেড গ্রাউন্ডে উদ্ধার করা এসব অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক প্রদর্শন করা হয়। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, মণিপুরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি অভিযান ও অন্যান্য নিরাপত্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
মণিপুরে নিরাপত্তা অভিযান জোরদারের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়েও যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। প্রায় এক বছর রাষ্ট্রপতি শাসনের পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ইয়ুমনাম খেমচাঁদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি সংঘাতকবলিত বিভিন্ন এলাকায় সফর করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।
এর অংশ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী চূড়াচাঁদপুর সফর করেন। ২০২৩ সালের মে মাসে জাতিগত সহিংসতা শুরুর পর এটিই ছিল ওই এলাকায় তার প্রথম সফর। সেখানে সাবেক বিধায়ক ভুংজাগিন ভালতের শেষকৃত্যে অংশ নেন তিনি। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বিভাজন কমিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ হিসেবে এ সফরকে দেখছে রাজ্য সরকার।
এ ছাড়া খেমচাঁদ ১১ ফেব্রুয়ারি ও ৪ এপ্রিল দুবার জিরিবাম সফর করেন। এসব সফরে সংঘাতপ্রবণ এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে নিষিদ্ধ কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টি-পিপলস ওয়ার গ্রুপের (কেসিপি-পিডব্লিউজি) ৪৬ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করে অস্ত্র জমা দেন।
সরকার জানিয়েছে, এর আগে পাঁচ মাসে ১ হাজার ২০০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি ছিল সরকারি অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪২২টিতে।
মণিপুরে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দাস কনথৌজাম গত মার্চে বিধানসভায় জানিয়েছিলেন, সংঘাতের সময় সরকারি অস্ত্রাগার, পুলিশ স্টেশন ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ৬ হাজার ২০টির বেশি অস্ত্র লুট হয়েছিল। পরে ১৫ জুন মণিপুর পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) মুকেশ সিং জানিয়েছিলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে (এনডিপিএস) ৭২টি মামলা করা হয়েছে এবং ১১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদক ও মাদকজাতীয় দ্রব্যও জব্দ করা হয়।
শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে গত মার্চে গুয়াহাটিতে কুকি-জো কাউন্সিলের (কেজেডসি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।
রাজ্য সরকারের ভাষ্য, নিরাপত্তা অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সশস্ত্র সদস্যদের আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন, মাদকবিরোধী অভিযান এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ—এই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপুরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও পুনর্মিলনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।
২০২৩ সালের ৩ মে মণিপুরে জাতিগত সহিংসতা শুরু হওয়ার পর তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে স্থায়ী শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফেরানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সংঘাতে প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।