পানি নেমেছে, থামেনি দুর্ভোগ: এক মাস পরও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় বান্দরবানের সাড়ে ১২ হাজার পরিবার
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বন্যার পানি নেমেছে প্রায় এক মাস আগে। স্বাভাবিক হয়েছে বান্দরবানের জনজীবন। সড়কে ফিরেছে যান চলাচল, খুলেছে দোকানপাট, ফিরেছে মানুষের কর্মব্যস্ততা। প্রশাসনের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২ হাজার ৫০০ পরিবারের কাছে সেই স্বাভাবিকতা এখনো অধরা। কারণ পানি নেমে গেলেও দুর্যোগের ক্ষত শুকায়নি। এক মাস পেরিয়ে গেলেও থমকে আছে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া।
বন্যার এক মাস পরও জেলার বিভিন্ন এলাকায় পড়ে আছে ধ্বংসের চিহ্ন। কোথাও ভেঙে পড়া ঘর, কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত বসতভিটা, আবার কোথাও বন্যার স্রোতে নষ্ট হয়ে যাওয়া সংসারের শেষ সম্বল। এসব দৃশ্যই বলে দিচ্ছে, পানি নেমে গেলেই মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয় না।
বান্দরবান শহরের বালাঘাটা আমবাগান পাড়ার বাসিন্দা অঞ্জনা তংচঙ্গ্যার ঘরও এবারের ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায়। বন্যার পানিতে মারা যায় তাঁর তিনটি ছাগল ও মুরগি। ভেসে যায় ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। একমাত্র বসতঘরটি হয়ে পড়ে বসবাসের অনুপযোগী।
বন্যার পানি নেমে গেলেও এখন সেই বিধ্বস্ত ঘরেই ঋণ নিয়ে কোনোমতে বসবাস করছেন অঞ্জনা তংচঙ্গ্যা।
তিনি বলেন, “এবারের বন্যায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তিনটি ছাগল, মুরগি, ঘরবাড়িসহ প্রতিটি জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। ঋণ নিয়ে আবার কোনোভাবে ঘরটি মেরামত করেছি। কিন্তু একপাশ এখনো হেলে পড়ে আছে। সরকার পরিদর্শনে এসে আমাদের পুনর্বাসন করে দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও পুনর্বাসন তো দূরের কথা, কেউ আর খোঁজও নেয়নি। আশ্বাস দিয়ে যায়, কিন্তু পরে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখি না।”
বন্যার পুরোপুরি এক মাস পেরিয়ে গেলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো একই চিত্র। কোথাও বিধ্বস্ত ঘর, কোথাও ভেঙে যাওয়া বসতভিটা। বন্যার স্রোত থেমেছে, কিন্তু রেখে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন।
অনেক পরিবার এখনো নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেনি। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ অন্যের জায়গায়। নতুন ঠিকানায় কোনোমতে দিন কাটলেও নিজেদের ঘরে ফেরার অপেক্ষা শেষ হয়নি। পুনর্বাসন কিংবা নতুন ঘরের আশায় দিন গুনছেন এসব বানভাসি মানুষ।

মন্ত্রীদের পরিদর্শন, আশ্বাস—বাস্তবায়ন কোথায়?
বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরপর পরিদর্শন করেছেন তিন প্রতিমন্ত্রী। শুরুতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং সবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে বানভাসি ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের আওতায় আনার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। এতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন ক্ষতিগ্রস্তরা। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাসের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন কোথায়—এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় বান্দরবানে ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে টিন ও নগদ তিন হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব সহায়তা অধিকাংশ বানভাসি পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বন্যার সময় ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা নিয়ে অনেকে পাশে দাঁড়ালেও পানি নেমে যাওয়ার পর তাদের খোঁজ নেওয়ার যেন আর কেউ নেই। যারা ঘর হারিয়েছেন, যাদের বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা জীবিকার উপকরণ নষ্ট হয়েছে—তাদের বর্তমান পরিস্থিতি দেখতে নিয়মিত কোনো কার্যকর উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
জেলার আমবাগান, ভরাখালী, কুহালং, দুংখি পাড়া, রোয়াজা পাড়াসহ সাত উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল। তলিয়ে গিয়েছিল ঘরবাড়ি। ভেসে গেছে বসতঘর, কৃষিক্ষেত, পালিত পশুপাখি এবং পুকুরের মাছ।
বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হলেও উপযুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের নাম তালিকায় আসেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে পানি নেমে যাওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও বান্দরবানের বন্যাকবলিত মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফেরেনি। দুর্যোগের পর প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন করে জীবন সংগ্রাম শুরু করেছেন অনেক বানভাসি মানুষ।
নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে থাকা এসব মানুষের কাছে এখন মন্ত্রীদের দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

আমবাগান এলাকার বাসিন্দা হ্লামেপ্রু ও সৌমিতা বড়ুয়া বলেন, “বন্যায় ছেলে-মেয়েদের খাতা-বই সব নষ্ট হয়ে গেছে। বাড়ির চারদিকে শুধু ভাঙনের চিত্র। মন্ত্রী পরিদর্শনে এসে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো সেই ভাঙা ঘরেই আমাদের জীবন সংগ্রাম চালাতে হচ্ছে।”
দুংখি পাড়া, রোয়াজা পাড়া ও আমতলী পাড়ার বাসিন্দা নুমংউ, উহ্লাপ্রু ও অবৈ বলেন, “ত্রাণ কখনো পাইনি। কেউ দিতেও আসেনি। মন্ত্রী আসার কথা তো দূরের বিষয়, প্রশাসনের লোকজনও খোঁজ নেয়নি। আগে যেভাবে চলছিলাম, সেভাবেই ভাঙা ঘর আর নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে ঋণ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। সরকার পাশে দাঁড়াবে না—এটা আমরা আগেই জানি।”
বরাদ্দ না থাকায় পুনর্বাসন থমকে আছে: জেলা প্রশাসক
পুনর্বাসন কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, “সরকারি উদ্যোগ বা বরাদ্দ না থাকায় পুনর্বাসন কার্যক্রম থমকে আছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, প্রশাসন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের টিন ও নগদ টাকা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকার যদি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে প্রশাসন কীভাবে কাজ করবে? তাছাড়া মনে হয় না তাদের পুনর্বাসনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তবে পরবর্তীতে কী নির্দেশনা আসে, সেটা পরে জানাতে পারব।”
প্রশাসনের এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২ হাজার ৫০০ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য কবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে? এক মাস আগে নেমে যাওয়া বন্যার পানি যেমন আর ফিরবে না, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনও শুধু আশ্বাসে ফিরে আসবে না। তাঁদের ঘুরে দাঁড়াতে এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তব পুনর্বাসন উদ্যোগ।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।