আরাকানে ফেরার আকুতি, সুযোগ পেলে তৃতীয় দেশে পাড়ি দিচ্ছেন শিক্ষিত রোহিঙ্গা তরুণরা
ছবি: রোহিঙ্গা সংগীত শিল্পী রুহুল খানের ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত।
![]()
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
মিয়ানমারের রাখাইনে নিজেদের জন্মভূমি আরাকানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রিতরা। ক্যাম্পে বসে জন্মভূমির স্মৃতিচারণ করে গানও গাইছেন অনেকে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় নয় বছরেও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ স্পষ্ট না হওয়ায় শিক্ষিত ও দক্ষ রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সুযোগ পেলে তৃতীয় কোনো দেশে নতুন জীবন শুরু করছেন।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জন্মভূমি আরাকানের স্মৃতিতে গাওয়া ‘ও আরাকান হাঁদেদ্দে দিল্লান, হতোদিন তোঁয়ার ন দেখির মুখ-খান’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংগীতশিল্পী রুহেল খানের কণ্ঠে গাওয়া গানটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ইউটিউবে গানটির দর্শকসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।
তবে আরাকানে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়ে গান গাওয়া সেই রুহেল খানই সম্প্রতি তৃতীয় দেশ হিসেবে কানাডায় পুনর্বাসিত হয়েছেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জানা গেছে।
কানাডা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের একটি অংশের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, আরাকানের জন্য আবেগঘন গান গেয়ে শেষ পর্যন্ত কানাডায় চলে যাওয়ার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
কবির আহমদ ও মোহাম্মদ রফিক নামে দুজন মন্তব্য করেন, ‘কানাডা তোমার জন্য আরাকান।’

শুধু রুহেল খান নন, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে থাকা শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের একটি অংশও এখন তৃতীয় কোনো দেশে নতুন জীবন শুরুর সুযোগ খুঁজছেন। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি কক্সবাজারের ৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক তরুণ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। প্রায় নয় বছর ক্যাম্পে কাটানোর পর বর্তমানে তিনি সেখানে কাজের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তরুণ বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবন শুরু করলেও তাঁর হৃদয়ে এখনো আরাকান রয়েছে। সুযোগ তৈরি হলে তিনি নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চান।
রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন সরকারের অনুমোদিত একটি প্রক্রিয়া। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাত হাজারের কিছু বেশি রোহিঙ্গা বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে তুলনামূলক কমসংখ্যক রোহিঙ্গা পুনর্বাসিত হচ্ছেন।
তবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন মিজানুর রহমান। তাঁর মতে, ক্যাম্পে থাকা শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ মনে করছেন, ভবিষ্যতে তাঁরাও উন্নত কোনো দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ পাবেন। কিন্তু এভাবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব নয়।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা রিপ্রেজেন্টেটিভের সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ মনে করেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তাঁর মতে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইনে তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কিছু রোহিঙ্গার জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলে এলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো কোনো সুস্পষ্ট ও টেকসই পথ তৈরি হয়নি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে তাদের বড় একটি জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ নানা প্রশ্নে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে একদিকে ক্যাম্পে জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি নিয়ে গান ও স্মৃতিচারণ অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষিত ও দক্ষ রোহিঙ্গাদের একটি অংশ তৃতীয় দেশে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। এতে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও সামনে আসছে—তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিকল্প, নাকি প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক আশ্রয় মাত্র?
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।