সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের বিপরীতে পাহাড়ে তরুণদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেনাবাহিনী!
Oplus_131072
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ ও যুবসমাজকে দক্ষ, আত্মনির্ভরশীল এবং কর্মমুখী জনশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কারিগরি ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। অস্ত্র ও সহিংসতার পথ থেকে তরুণদের দূরে রেখে শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার এ উদ্যোগ পাহাড়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন সেনা জোনে আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এসব কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে চলবে। প্রশিক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি, মোবাইল ফোন মেরামত, কম্পিউটার, ইলেকট্রিশিয়ান, যন্ত্রপাতি মেরামত, যানবাহন মেকানিক এবং টেইলারিংসহ বিভিন্ন কারিগরি ও পেশাভিত্তিক কোর্স।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এ বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে স্থানীয় তরুণদের হাতে বাস্তবমুখী দক্ষতা তুলে দেওয়া তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দক্ষতা উন্নয়নে খাগড়াছড়িতে একাধিক প্রশিক্ষণ
খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতায় চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও মেকানিক্যাল খাতে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে দুই ধাপে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে প্রথম ধাপে গত ২ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মোট ২৩ জনকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৫ জন পাহাড়ি এবং ৮ জন বাঙালি তরুণ-তরুণী রয়েছেন।
দ্বিতীয় ধাপে ২৩ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৩৪ জনকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ দলের মধ্যে ৯ জন পাহাড়ি এবং ২৫ জন বাঙালি প্রশিক্ষণার্থী রয়েছেন।
এ ছাড়া একই সময়ে ২৩ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১০৮ জনকে মোবাইল ফোন মেরামতের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন পাহাড়ি এবং ৬৪ জন বাঙালি।
পাশাপাশি কম্পিউটার, যন্ত্রপাতি মেরামত ও ইলেকট্রিশিয়ান প্রশিক্ষণেও তরুণদের যুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে ৩৫ জন পাহাড়ি এবং ৩৮ জন বাঙালি অংশ নিচ্ছেন।
প্রশিক্ষণগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে এমন দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যারা প্রশিক্ষণ শেষে নিজ এলাকায় চাকরি বা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। বিশেষ করে মোবাইল মেরামত, কম্পিউটার ও ইলেকট্রিশিয়ান প্রশিক্ষণের মতো কোর্সগুলো তরুণদের দ্রুত আয়মুখী কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রাঙামাটিতে ৯৫ তরুণ-তরুণীকে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ
রাঙামাটি রিজিয়নের আওতাধীন এলাকাতেও তরুণ-তরুণীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
এ রিজিয়নে মোট পাঁচটি প্রধান বিষয়ে ৯৫ জন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ২৬ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ জন পাহাড়ি তরুণীকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আগামী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে আরও চারটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে টেইলারিং বা দর্জি কাজে ২০ জন, কম্পিউটার প্রশিক্ষণে ২৫ জন, যানবাহন মেকানিক প্রশিক্ষণে ১৫ জন এবং মোবাইল ফোন মেরামত প্রশিক্ষণে ২০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব প্রশিক্ষণে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে পরিবারভিত্তিক আয়ের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথও তৈরি হতে পারে।
পাহাড়ে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের জন্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি। তরুণদের হাতে দক্ষতা তুলে দেওয়া গেলে তারা স্থানীয় অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
বিশেষ করে মোবাইল মেরামত, কম্পিউটার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক ও টেইলারিংয়ের মতো প্রশিক্ষণ সরাসরি আত্মকর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। একজন প্রশিক্ষিত তরুণ নিজে কাজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারেন।
অন্যদিকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত জনবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তরুণদের ইতিবাচক পথে রাখার উদ্যোগ
পার্বত্য চট্টগ্রামে তরুণ সমাজকে ঘিরে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, তরুণদের হাতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে তারা উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এতে অপরাধ, মাদক, সহিংসতা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতে পারে।
সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ তাই শুধু প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে।
চার রিজিয়নে বিস্তৃত হচ্ছে কর্মমুখী উদ্যোগ
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পাশাপাশি বান্দরবান ও গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন সেনা জোনেও আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মমুখী ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের প্রচলিত চাকরির ওপর নির্ভরশীল না রেখে দক্ষতার মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ানো।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থান বা আত্মকর্মসংস্থানে সহায়তা করা গেলে এ উদ্যোগের সুফল আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালু রাখা গেলে পাহাড়ে একটি দক্ষ ও উৎপাদনশীল তরুণ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব।
উন্নয়ন ও শান্তির জন্য মানবসম্পদে বিনিয়োগ
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তরুণদের হাতে অস্ত্র নয়, দক্ষতা ও কর্মের সুযোগ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রিজিয়নের আওতায় পরিচালিত এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সেই লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের দক্ষ করে গড়ে তুলে তাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তা একদিকে যেমন পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও শক্তিশালী করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পাহাড়ের আরও বেশি তরুণ-তরুণী কারিগরি ও পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। আর দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের এই বিস্তারই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।