পাহাড়ে শান্তির প্রহরী: সেনাবাহিনীর উপস্থিতিই স্থিতিশীলতার শক্ত ভিত
ছবি- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া।
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক কর্তব্য। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সেই দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সীমান্ত, উপকূল, দুর্গম চর কিংবা পাহাড়—ভূপ্রকৃতি ভিন্ন হলেও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দায়িত্বের জায়গাটি অভিন্ন। সেই বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল, দীর্ঘ সীমান্ত, বিচ্ছিন্ন জনপদ এবং অনেক এলাকায় সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এ অঞ্চলকে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর সঙ্গে রয়েছে সীমান্তপথে অবৈধ যাতায়াত, মাদক ও অস্ত্রের ঝুঁকি, চোরাচালান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার মতো চ্যালেঞ্জ। ফলে পাহাড়ে কার্যকর নিরাপত্তা উপস্থিতি শুধু রাষ্ট্রের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপদ জীবনযাপনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা শূন্যতা নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল উপস্থিতির
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমতলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি যেখানে স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়, পাহাড়ের ক্ষেত্রে একই বিষয়কে অনেক সময় ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু প্রশ্নটি হওয়া উচিত—দুর্গম পাহাড়ি জনপদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
যেখানে দুর্গমতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন, যেখানে প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত কোনো ঘটনা মোকাবিলা করা সহজ নয়, সেখানে প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে।
পাহাড়ের শান্তিকামী মানুষ—পাহাড়ি কিংবা বাঙালি—সবার প্রয়োজন একই: নিরাপদ জীবন, নির্বিঘ্ন চলাচল, সন্তানদের শিক্ষা, কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজার, কর্মসংস্থান এবং ভয়মুক্ত সামাজিক পরিবেশ।
এই মৌলিক প্রয়োজনগুলো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটি পূর্বশর্ত।

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সহিংসতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ ও ঘটনা সামনে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষই।
কোনো কৃষক যদি নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে না পারেন, কোনো ব্যবসায়ী যদি চাঁদাবাজির ভয়ে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারেন, কোনো পরিবার যদি সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে—তাহলে সেখানে উন্নয়নের সুফলও বাধাগ্রস্ত হয়।
সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষারও বিষয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে মানুষ নিজের জমিতে চাষ করতে পারে, ব্যবসা করতে পারে, শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যেতে পারে এবং প্রত্যন্ত এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হয়।
পাহাড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রাণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের।
বর্ষায় পাহাড়ি ঢল কিংবা ভূমিধসে যখন কোনো জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন দ্রুততম সময়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তায় পরিণত হয়।
একইভাবে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, ক্রীড়া সামগ্রী প্রদান, স্থানীয় অবকাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
এ কারণেই পাহাড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু অস্ত্র ও নিরাপত্তার আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে বাস্তব চিত্রের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
নিরাপত্তা ও উন্নয়ন—একই মুদ্রার দুই পিঠ
কোনো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সেখানে নিরাপদ পরিবেশ অপরিহার্য। বিনিয়োগ, পর্যটন, ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা কিংবা যোগাযোগ—সবকিছুর ভিত্তি হলো স্থিতিশীলতা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল। পাহাড়, বন, নদী, হ্রদ, পর্যটনকেন্দ্র, কৃষি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা থাকলে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন।
তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়াকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।
শান্তি ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আর উন্নয়ন ছাড়া শান্তির ভিত্তিও দুর্বল থাকে।
এই বাস্তবতাতেই পাহাড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অপপ্রচার নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন
পাহাড়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে কোনো অভিযোগ, প্রশ্ন বা সমালোচনা থাকলে তা অবশ্যই যাচাইযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচিত হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে। একইভাবে তাদের অবদান ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডও তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হওয়া প্রয়োজন।
কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো একটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা মূল্যায়ন করলে বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য, অতিরঞ্জিত বক্তব্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা পাহাড়ের সংবেদনশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই পাহাড় নিয়ে আলোচনায় আবেগের চেয়ে তথ্য, প্রচারণার চেয়ে বাস্তবতা এবং বিভাজনের চেয়ে শান্তি ও সহাবস্থানের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই হোক মূল বিবেচনা
পাহাড়ে সেনাবাহিনী থাকবে কি থাকবে না—এই বিতর্কের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে।
যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক, তার কেন্দ্রে থাকতে হবে পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক যেন নিরাপদে বসবাস করতে পারেন, সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারেন, কৃষি ও ব্যবসা করতে পারেন এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন—এটাই হওয়া উচিত সবার অভিন্ন লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য পূরণে সেনাবাহিনী, প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পাহাড়ের ভবিষ্যৎ সংঘাতে নয়, স্থিতিশীলতায়
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এই অঞ্চলের মানুষ কতটা নিরাপদ, শিক্ষিত, দক্ষ ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছেন তার ওপর।
সশস্ত্র সহিংসতা, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র কিংবা ভয়ভীতির পরিবেশ কোনো জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না। বিপরীতে নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, পর্যটন ও সামাজিক সম্প্রীতিই পারে পাহাড়কে সম্ভাবনার নতুন দুয়ারে নিয়ে যেতে।
আর সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সমন্বিত দর্শন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে তাই কেবল একটি নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে না দেখে পাহাড়ের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থা আরও গভীর করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হবে।
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কোনো একক প্রতিষ্ঠান দিয়ে তৈরি হবে না। তবে নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া সেই পথও নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
সুতরাং লক্ষ্য হওয়া উচিত—পাহাড়ে বিভাজন নয়, সম্প্রীতি; ভয় নয়, নিরাপত্তা; সংঘাত নয়, উন্নয়ন; এবং বিচ্ছিন্নতা নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের পারস্পরিক আস্থার শক্ত ভিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি তাই প্রয়োজনের বিষয়—বিতর্কের নয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।