রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব। তবে সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকিও তত বাড়বে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য নানা ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এ সংকট বাংলাদেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেওয়া হলেও বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশে তাদের অনির্দিষ্টকাল অবস্থান নয়; বরং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন। এ জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক চাপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্যাম্পগুলোতে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সুযোগে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হলে তা শুধু ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তাই আশ্রয়শিবিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক সমস্যার পাশাপাশি নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। এ কারণে সংকটের মূল কারণ সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও সফল প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের ধারাবাহিক ও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সহায়তা করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না; তাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর অগ্রগতি না পাওয়ায় সংকটটি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। ফলে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও এখন আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে পারেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি উঠে এসেছে। দ্রুত প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে এর বহুমাত্রিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।