দুর্গম লংগদুতে বদলের ছোঁয়া, জনসেবায় মাঠমুখী উপজেলা প্রশাসন

দুর্গম লংগদুতে বদলের ছোঁয়া, জনসেবায় মাঠমুখী উপজেলা প্রশাসন

দুর্গম লংগদুতে বদলের ছোঁয়া, জনসেবায় মাঠমুখী উপজেলা প্রশাসন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পাহাড়, বন আর কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত রাঙামাটির লংগদু উপজেলা। ভৌগোলিক দুর্গমতা, যোগাযোগ সংকট, সীমিত নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নানা উন্নয়ন ঘাটতির কথা বলে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা। তবে গত এক বছরে উপজেলা প্রশাসনের একাধিক জনমুখী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বদলের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।

বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর হোসাইনের নেতৃত্বে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি সেবা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা ও হ্রদবেষ্টিত গ্রামগুলোতে গিয়ে মানুষের সমস্যা শোনা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সরেজমিনে তদারকির ফলে প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

লংগদু উপজেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে শিশুদের জন্য নির্মিত ‘শিশু অবকাশ’। উপজেলা সদরে শিশুদের বিনোদন, মানসিক বিকাশ ও অবসর কাটানোর জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না। ফলে শিশুদের নিয়ে বিনোদনের জন্য অনেক পরিবারকে দূরের এলাকায় যেতে হতো। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশ তৈরির এ উদ্যোগ অভিভাবকদের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্গমতার বাধা কাটানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। লংগদুর শিলাছড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী অনেক মানুষের জন্মনিবন্ধন না থাকায় সরকারি বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়তে হতো। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এসব এলাকায় সরাসরি গিয়ে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে নাগরিক সনদ পেতে উপজেলা সদরে বারবার যাতায়াতের ভোগান্তি কমছে এবং প্রান্তিক মানুষের সরকারি সেবার আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

দুর্গম লংগদুতে বদলের ছোঁয়া, জনসেবায় মাঠমুখী উপজেলা প্রশাসন

ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। মাইনীমুখ বাজারসংলগ্ন ভরাট করা খাসজমিতে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে সরকারি জমি ব্যবহারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় তরুণদের খেলাধুলার জন্য একটি স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়মিত ক্রীড়া চর্চার সুযোগ বাড়লে স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসার সম্ভাবনাও বাড়বে।

কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতেও অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাইড ওয়াল নির্মাণ, গ্রামীণ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন, সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রমে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ও রয়েছে। এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন ও তদারকির মাধ্যমে কাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জনস্বার্থ রক্ষায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মতো কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণ, ভোক্তা অধিকার এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, লংগদুর ফেরিঘাট ইজারা থেকে অতীতে সর্বোচ্চ প্রায় ৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও চলতি অর্থবছরে ইজারা বাবদ আদায় হয়েছে ২৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা। রাজস্ব আদায়ে এই বৃদ্ধি সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও ইজারা প্রক্রিয়ায় কার্যকর তদারকির বিষয়টি সামনে এনেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতিরিক্ত রাজস্বের অর্থ স্থানীয় জনসেবামূলক কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটগুলোতে যাত্রী ছাউনি নির্মাণও এর অংশ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে উদ্যোগ, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দুর্গম লংগদুতে বদলের ছোঁয়া, জনসেবায় মাঠমুখী উপজেলা প্রশাসন

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের উপস্থিতি বাড়ায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারি দপ্তরের যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় সরাসরি গিয়ে সমস্যা শোনা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সম্পৃক্ত করে সমাধানের চেষ্টা করায় প্রশাসনের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশা বাড়ছে।

স্থানীয়দের মতে, দুর্গম লংগদুর বাস্তবতা বিবেচনায় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সরকারি সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উপজেলা সদরে বসে পরিকল্পনা করলে দুর্গম এলাকার অনেক বাস্তব সমস্যা অগোচরে থেকে যেতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে এসব সমস্যা চিহ্নিত করা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

এ বিষয়ে ইউএনও জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, “সরকারি সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়, সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। লংগদুর ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। সবার সহযোগিতা পেলে লংগদুকে একটি আধুনিক, সুশাসনভিত্তিক ও উন্নত উপজেলায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।”

লংগদুর মতো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও হ্রদবেষ্টিত উপজেলায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ, শিশুদের জন্য বিনোদন ও ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরি, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষি সহায়তা, রাজস্ব আহরণ এবং আইনশৃঙ্খলা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ স্থানীয় উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

সচেতন মহলের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি প্রকল্প নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পরিবেশ, ক্রীড়া, কৃষি ও নাগরিক সেবাকে একই উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে লংগদুর উন্নয়ন আরও টেকসই হবে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল আরও বিস্তৃত পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

দুর্গম পাহাড়ি এই জনপদে গত এক বছরে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তাই শুধু কিছু অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং স্থানীয় প্রয়োজনকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে লংগদুর দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি কমিয়ে একটি জনবান্ধব ও কার্যকর স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টান্ত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *