দুর্গম পাহাড়ের ৫০ পাড়ায় বাড়ির কাছেই মিলছে সুপেয় পানি

দুর্গম পাহাড়ের ৫০ পাড়ায় বাড়ির কাছেই মিলছে সুপেয় পানি

দুর্গম পাহাড়ের ৫০ পাড়ায় বাড়ির কাছেই মিলছে সুপেয় পানি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

একসময় পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি ও ঝর্ণার ঘোলা-কাদাযুক্ত পানিই ছিল বান্দরবানের দুর্গম এলাকার মানুষের প্রধান ভরসা। সুপেয় পানির সন্ধানে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো কয়েক কিলোমিটার। কোথাও আবার পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রায় হাজার ফুট নিচে নেমে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এতে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহেই দিনের বড় একটি সময় ব্যয় করতেন স্থানীয় নারী ও শিশুরা।

সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর ফলে দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগের চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। জেলার দুর্গম এলাকার অন্তত ৫০টি পাড়ায় এখন বাড়ির কাছেই পাওয়া যাচ্ছে নিরাপদ ও সুপেয় পানি। গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, গভীর নলকূপ ও পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব এলাকায় পানির সংকট মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) বান্দরবান জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্গম এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর আওতায় ১২টি পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন এবং ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব উদ্যোগের ফলে জেলার দুর্গম অন্তত ৫০টি পাড়ার বাসিন্দারা এখন স্থানীয়ভাবে স্থাপিত পানির কল থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে পাহাড়ি জনপদে দীর্ঘদিনের নিরাপদ পানির সংকট অনেকটাই কমে এসেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্গম এলাকায় পুরোনো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি নতুন বিভিন্ন প্রযুক্তির পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মূল অংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কয়েকটি স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কিছু কাজ বাকি রয়েছে।

উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম বলেন, জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা এখন বাড়ির পাশেই স্থাপিত পানির কল থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপদ পানি সহজলভ্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন নারী ও শিশুরা। আগে পানি সংগ্রহ করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে তাদের দৈনন্দিন কাজের বড় একটি অংশ পানির পেছনে ব্যয় হতো। এখন বাড়ির কাছেই পানি পাওয়ায় সেই সময় তারা পরিবারের অন্যান্য কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা, পড়াশোনা কিংবা আয়মূলক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগাতে পারছেন।

বান্দরবান সদরের একটি গ্রামের বাসিন্দা মাচিং মারমা বলেন, আগে পাহাড়ের নিচে ঝিরিতে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এখন সরকার পানির কল বসিয়েছে। সেখান থেকেই পুরো পাড়ার মানুষ পানি সংগ্রহ করছেন।

একই এলাকার বাসিন্দা উখ্যাই ম্যা মারমা বলেন, আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। এখন গ্রামের মানুষ সহজেই পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি এসেছে।

স্থানীয়রা জানান, নিরাপদ পানি পাওয়ার সুবিধা শুধু দৈনন্দিন দুর্ভোগই কমায়নি, এর সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরির পানি মাটি, কাদা ও বিভিন্ন ধরনের ময়লায় দূষিত হয়ে পড়ত। বাধ্য হয়ে ওই পানি ব্যবহারের কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও থাকত। নতুন পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ফলে সেই ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, পার্বত্য এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকার মানুষের সুপেয় পানির সংকট নিরসন তারই অংশ। ভবিষ্যতে পানি সংকটে থাকা পার্বত্য তিন জেলার অন্যান্য এলাকাতেও নিরাপদ পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রয়োজন চিহ্নিত করে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শুধু নিরাপদ পানি নয়, বান্দরবান পৌর এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট নির্মাণ, ৮৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট উন্নয়ন, পাঁচটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং আটটি পাবলিক টয়লেট সংস্কারের কাজ চলছে। এর মধ্যে কয়েকটির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত ৩০টি শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হলে নিরাপদ পানি সরবরাহের পাশাপাশি স্যানিটেশন ব্যবস্থারও উন্নতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহের এই উদ্যোগকে স্থানীয়রা দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক সমস্যা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পানি সংগ্রহের কষ্ট কমার পাশাপাশি নারীদের সময় সাশ্রয়, শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দুর্গম যেসব পাড়া এখনও নিরাপদ পানির সুবিধার বাইরে রয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব এলাকাকেও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে পাহাড়ি জনপদে সুপেয় পানির সংকট আরও কার্যকরভাবে দূর করা সম্ভব হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *